ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় তুরস্ক সফরে গোপনে বিমান বদলেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প

প্রকাশ:

গত মাসে তুরস্ক সফরের শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকির খবর পাওয়া যায়। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে আঙ্কারা সফরের সময় ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে সিক্রেট সার্ভিস এই ঝুঁকি শনাক্ত করে। গোয়েন্দা তথ্যের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছে যে, হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। দ্বিতীয় একটি সূত্র জানায়, হামলাকারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলেও তাদের অভিপ্রায় ছিল স্পষ্ট, যা সিক্রেট সার্ভিসকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

৮ই জুলাই তুরস্ক থেকে উড্ডয়নের ঠিক আগে এক নজিরবিহীন কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে মূল নীল-সাদা এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও সাধারণ সি-৩২এ বিমানে উঠে পড়েন। একই সময়ে এয়ার ফোর্স ওয়ান আলাদাভাবে উড্ডয়ন করে, যেখানে প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, হোয়াইট হাউসের কর্মী এবং ১৩ সদস্যের প্রেস পুলের সাংবাদিকরা ছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ক্যাটারিং ট্রাকে করে বিমান বদল করা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যান স্ক্যাভিনো, নির্বাহী সহকারী ন্যাটালি হার্প এবং ওভাল অফিসের কার্যক্রম পরিচালক ওয়াল্ট নাউটা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশেই তিনি এই বিমান বদল করেন এবং আঙ্কারা থেকে বৃটেনে জ্বালানি নেওয়ার জন্য বিরতি দিয়ে যাত্রা সম্পন্ন করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি যে বিমানে ছিলেন তার চেয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানই বেশি ঝুঁকির মুখে ছিল, কারণ হামলাকারীরা সম্ভবত সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করত। যদিও এই দাবির সপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আঙ্কারায় ট্রাম্পের অবস্থান এবং হোটেলের কোন তলায় তিনি ছিলেন, তা ইরানিরা জেনে গিয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন।

মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডগলাস বার্কি জানান, হুমকিটি সম্ভবত নতুন ধরনের তাপ-সন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ছিল, যা রাডারে ধরা পড়ে না। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের এসএ-৬৭ ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্করণে সাধারণ রেল-লঞ্চার ব্যবহৃত হয় এবং এটি তাপ-সন্ধানী ও লেজার-নির্দেশনা উভয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম। এছাড়া রাশিয়ায় তৈরি ৯কে৩৩৩ ভারবা ক্ষেপণাস্ত্রও কাঁধে বহনযোগ্য তাপ-সন্ধানী অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। এসব অস্ত্র উড়োজাহাজের উত্তপ্ত ইঞ্জিনকে অনুসরণ করে আঘাত হানে, যা সামরিক পরিকল্পনাবিদদের জন্য উদ্বেগের কারণ।

নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গোপনে ভ্রমণের নজির থাকলেও সাধারণত সাংবাদিকদের এ বিষয়ে আগাম জানানো হয়। ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বাগদাদ সফরের সময়ও কয়েকজন সাংবাদিককে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এবার সিক্রেট সার্ভিসের হাতে সময় কম থাকায় কোনো ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটার এক মাসেরও বেশি সময় পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে এয়ার ফোর্স ওয়ানকে একটি বিভ্রান্তিমূলক বিমান বা ‘ডিকয়’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং উপস্থিত ছিলেন।

প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানে সাংবাদিক ও সহযোগীদের রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রথম সূত্রটি দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে শত্রুতা ও তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঝুঁকি অনেক বেশি ছিল। তাই প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে এই কৌশল গোপন রাখাই ছিল সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে অবহিত করা হয়েছিল বলেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

গোয়েন্দা তথ্যটি কোথা থেকে এসেছিল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ওই সূত্র।

সূত্রটি বলেছেন, তারা এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছিল, যা তারা মনে করেছিল খুব শিগগিরই ঘটতে পারে।

পাশাপাশি ছিলেন নিয়মিত ১৩ সদস্যের প্রেস পুল, যার মধ্যে রয়টার্সের একজন সংবাদদাতা ও একজন আলোকচিত্রীও ছিলেন।

তখন ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে।

এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের গতিবিধি গোপন রাখতে নজিরবিহীন এক অভিযান চালানো হয়।

এ কারণেই বিমানগুলোকে উড্ডয়ন করতে দেয়া হয়েছিল।

প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার নির্দেশে তিনি আঙ্কারা থেকে বৃটেনে জ্বালানি নেয়ার জন্য একটি বিরতিস্থলের উদ্দেশে উড়াল দেন।

প্রচলিত রাডার-নির্দেশিত হুমকির তুলনায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন।

কারণ এগুলো কোনো শনাক্তযোগ্য রেডিও তরঙ্গ পাঠায় না।

ফলে হঠাৎ করেই যেকোনো দিক থেকে চলে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বার্কি।

নিরাপত্তার স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্র বা উচ্চঝুঁকির এলাকায় সফরের সময় ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মাঝে মাঝে গোপনে ভ্রমণ করেন।

তবে বুশের থ্যাংকসগিভিং ছুটি কাভার করতে টেক্সাসের ক্রফোর্ডে থাকা অন্য সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।

তাদের বলা হয়েছিল, বুশ পরিবারের সঙ্গে ছুটির দিনটি কাটাবেন।

কিন্তু হঠাৎ বুশ ইরাকে উপস্থিত হলে তারা বিস্মিত হয়ে যান।

কয়েকজন গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রেসিডেন্টকে বহন করছে বলে ধারণা করা বিমানটিতে ট্রাম্পের সহযোগী ও সাংবাদিকদের রেখে যাওয়ার ফলে তাদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল কি না।

শেয়ার করুন