এক এগারোর সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। জেআইসি বা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের পর তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, দু’জন সাক্ষী এবং গ্রেপ্তার হওয়া দু’জন আসামির জবানবন্দিতে তারেক রহমানকে নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া গেছে। সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তদন্ত সংস্থায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জানিয়েছেন, ডিজিএফআই কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের নামে তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তাকে যে রুমে বন্দি রাখা হয়েছিল, সেই একই রুমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকেও এনে নির্যাতন করা হয়। আযমীর তথ্যমতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে দুইবার জেআইসিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, যা তিনি বন্দি থাকাবস্থায় তাকে খাবার সরবরাহ করা লোকদের কাছে শুনেছেন। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে তদন্ত সংস্থায় জিজ্ঞাসাবাদেও এ বিষয়ে তথ্য মিলেছে। তখন তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কমান্ড্যান্ট স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে কর্মরত ছিলেন।
শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্য দেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। ওদিকে গতকাল পরিদর্শনের পর ‘আয়নাঘর’-এর বিভিন্ন সেলের বর্ণনা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, চারটি স্থাপনার মধ্যে টিএফআই সেলকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে হয়েছে। সেখানে শ্রেণিভেদে বন্দিদের আলাদা করা হতো বলে ধারণা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, একজন মানুষকে যখন দিনের পর দিন বন্দি করে রাখা হয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন সেটিই ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি। সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৬টি স্থায়ী সেল ছিল। এক অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৬ ফুট বাই ৬ ফুট এবং অন্য অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন ছিল ১২ ফুট বাই ৮ ফুট।
জেআইসি সেলের কাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, কক্ষগুলো সাউন্ডপ্রুফ রাখার ব্যবস্থা ছিল, যাতে ভেতরের কোনো কান্নার আওয়াজ বাইরে না যায়। ভারী এক্সজস্ট ফ্যান ছিল, কোনো জানালা ছিল না। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মধ্যে মানুষকে রাখা হতো। তিনি আরও বলেন, কোন কক্ষ কতো বড় বা ছোট, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের একজন নাগরিককে এভাবে বন্দি রাখা। শনিবার দুপুরে কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) অধীনে থাকা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসি পরিদর্শনে যান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং রেজিস্ট্রার আবু সালেহ মোহাম্মদ রুহুল ইমরান। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর জেআইসি পরিচিতি পায় ‘আয়নাঘর’ নামে। বন্দিদের পরিচয় গোপন রাখতে বিভিন্ন শিল্পকর্মের নাম (কোডনেম মোনালিসা) হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পর জেআইসি’র মূল কাঠামো ও সম্ভাব্য আলামতের একটি বড় অংশ নষ্ট করা হয়েছে, ফলে বলপূর্বক গুম ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো টিএফআই সেল, জিআইসি সেল বা তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ প্রতিষ্ঠিত না করার আহ্বান জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু কোনো নাগরিক যেন বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে অহেতুক হয়রানি বা গোপন বন্দিশালায় দিনের পর দিন বন্দি না থাকেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারের কথিত অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এসব টর্চার সেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ধরে এনে আটকে রাখা হতো। অনেককে সেখান থেকে পরবর্তীতে গুম করা হয়েছে। এখনো বহু গুমের শিকার ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ডিফেন্সের আইনজীবীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরা শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলেন। শেখ হাসিনা যেমন যখন যা মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদের প্রতিনিধিরাও একইভাবে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেন। জাতিকে আর বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই। এই দেশের মানুষ নিজেরাই ভুক্তভোগী।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও এভিডেন্সে যা উঠে এসেছে, আমরা সেটিই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমরা কোনো গোপন বিচার করছি না, কোনো ক্যামেরা ট্রায়ালও করছি না। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম চলছে এবং সারা বিশ্বের মানুষ এই বিচার দেখছে। আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কী কারণে একজন নাগরিককে আটক রাখা হয়েছিল, কেন এই আয়নাঘরের প্রয়োজন হয়েছিল-এর ব্যাখ্যা তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে। এই ব্যাখ্যা প্রসিকিউশন দেবে না; এর দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে লোকজনকে অবৈধভাবে আটকে রাখা ও নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এসব গোপন বন্দিশালা সাধারণ মানুষের কাছে আয়নাঘর নামে পরিচিত। এখানে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। এতে অভিযুক্ত আসামিদের তালিকায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা জিআইসি পরিদর্শনের পর সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আযমীর দেয়া সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তার দাবি, ট্রাইব্যুনালে আযমী বলেছেন, বন্দিশালায় থাকাকালে তিনি আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য ও গাছপালা কিছুই দেখেননি। অথচ আজ পরিদর্শন করা কক্ষটির দক্ষিণ দিকে দু’টি জানালা রয়েছে এবং সেখান দিয়ে আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের মতে, বন্দিশালাটিকে ‘আর্ট গ্যালারি’ নামে ডাকা হতো এবং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন নাগরিককে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখতে পারে না।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি হিসেবে দৈনিক -এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ গুম, খুন কিংবা কথিত ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন
যা জেআইসিতে রক্ষিত রেজিস্টারে নির্দিষ্টভাবে লেখা আছে।
সেখানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর কাউকে আটকে রাখার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, জহিরুল আমিন, ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী ও তাসমিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
ডিফেন্সের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন- আজিজুর রহমান দুলু, ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ, ব্যারিস্টার মাহিন রহমান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
অনেক ভুক্তভোগীকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ গুম, খুন কিংবা কথিত ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে।
প্রায় ২৫০ জনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ইলিয়াস আলী, সুমনসহ বহু ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মামলাটি বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন রয়েছে।
মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
৩ আসামির পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ বলেন, জেআইসি ছিল সিটিআইবি-এর আওতাধীন।
জেলার যেমন সিদ্ধান্ত নেন না যে এখানে কাকে আনা হবে, কতোদিন রাখা হবে, কবে ছাড়া হবে।
আমার ক্লায়েন্টের ভূমিকাও একই রকমের ছিল।
এতে দিবালোকের মতো পরিষ্কার, মিস্টার আযমী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
দোতলা ভবনের নিচতলায় থাকা জেআইসি বন্দিশালাটি দুই অংশে বিভক্ত।
এসব সেলের দেয়াল সিমেন্ট দিয়ে এবড়ো-থেবড়োভাবে তৈরি করা।
কয়েকটি সেলে এক্সহস্ট ফ্যান, লোহার শিক ও কাঠের দরজা ছিল।
স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ দায়িত্বে এমওডিসি ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন।
বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ডিজিএফআইয়ের এমআই রুমে কর্মরত চিকিৎসক ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরাও দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা গেছে।
তদন্তের সময় স্থাপনাটি পরিদর্শন করে দেয়াল, দরজা, জানালা ও অন্যান্য কাঠামোতে পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সূত্র: মানবজমিন








