২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের সেই সকালের পর গত ২৫ বছরে বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে গেছে। ৯/১১ পরবর্তী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ সময় পশ্চিমা দেশগুলো যখন তালেবান, আইএসআইএস কিংবা ইরাকের জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত ছিল, তখন রাশিয়া ও চীন গোপনে ব্যাপক অস্ত্রসজ্জা কর্মসূচি গ্রহণ করে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রযুক্তির উদ্ভাবন নেটোর একসময়ের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার এই সময়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, আমরা শতাব্দীর প্রথম ২০ বছর প্রায় পুরোপুরি সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও বিদ্রোহ দমনে ব্যয় করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে সামরিক শক্তি ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনের উত্থানকে পশ্চিমা বিশ্ব সেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেনি। একইভাবে, জেনারেল শিরেফ ২০১৬ সালে ‘ওয়ার উইথ রাশিয়া’ শিরোনামে একটি রাজনৈতিক থ্রিলার লিখেছিলেন, যেখানে তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার মতে, কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পরও তা কৌশলগত সুবিধার জন্য কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়াটা বড় ঘাটতি।
নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান সিবিলাইনের প্রধান বিশ্লেষক স্যাম অলসেনের মতে, ৯/১১-এর পর সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ হারিয়ে ফেলা একমাত্র ভুল নয়; তারা চীনের উত্থানের প্রকৃতিও সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। তারা ধারণা করেছিল, অর্থনৈতিক একীভবন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমমুখিতা তৈরি করবে। বর্তমানে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও এমআই৬-এর শীর্ষ গোয়েন্দা লক্ষ্যগুলোর একটি। অলসেন আরও বলেন, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীনের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে অবগত থাকলেও, সবগুলো মিলে যে সামগ্রিক চিত্র তৈরি হচ্ছে, তা সবসময় ধরতে পারছে না। চীনের শক্তি এখন কেবল জাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর ও টেলিযোগাযোগ শিল্পের মতো কৌশলগত খাতে বিস্তৃত। ফলে সমস্যাটি প্রায়শই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা নয়, বরং কৌশলগত ব্যাখ্যার ব্যর্থতা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের আবির্ভাবের ফলে বিশ্ব রাজনীতির এই পরিবর্তন আরও দ্রুততর হবে। তবে এই পরস্পরবিরোধী স্বার্থের বিশ্বে গোয়েন্দা ব্যর্থতা বা কৌশলগত ভুল হিসাবের দায় কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর নয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা, যাকে অনেকে ইসরাইলের ‘নিজস্ব ৯/১১’ বলে অভিহিত করেছেন, তা বিশ্ব নিরাপত্তার নতুন সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
দীর্ঘ দুই দশকের এই যাত্রায় বড় ধরনের জাতীয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে এখনো প্রশ্ন উঠছে। প্রেসিডেন্ট বুশের ইরাক আক্রমণে ব্রিটেনের অংশগ্রহণ, আফগানিস্তানে অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডমে যোগ দেওয়া এবং দুই দশক পর তালেবানের হাতে দেশটি ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো নিয়ে বিতর্ক ও পর্যালোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চমৎকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে কোনো লাভ নেই, যদি তা কৌশলগত সুবিধার জন্য কাজে লাগানো না যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বড় বিপদ হলো তারা পৃথক অংশগুলো দেখতে পায়, কিন্তু সবগুলো মিলে কী চিত্র তৈরি করছে তা সবসময় বুঝতে পারে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের আবির্ভাবের ফলে এই পরিবর্তন আরো চলতে থাকবে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা হবে সূচকীয় গতিতে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








