ইসলামাবাদ স্মারকের মেয়াদ শেষ: মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কৌশলে ইরান

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি বা ‘ইসলামাবাদ স্মারক’-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই ইরান তাদের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন থেকে তারা কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকবে না, বরং মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদুল্লাহ জাভানি জানান, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে তাদের বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত মে মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই ‘ইসলামাবাদ স্মারক’ সই করেছিলেন। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে এই চুক্তি করা হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত হতো। তবে সোমবার (১৭ আগস্ট) সমঝোতার মেয়াদ শেষ হলেও কোনো পক্ষই তা নবায়নে সম্মত হয়নি। উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

জাভানি স্পষ্ট করেছেন যে, শত্রুপক্ষ আগে যুদ্ধ শুরু করায় ইরান এতদিন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও প্রতিপক্ষের জন্য ‘স্ট্র্যাটেজিক সারপ্রাইজ’ বা বড় ধরনের চমক অপেক্ষা করছে বলে সতর্ক করেছেন। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মোহেব্বি গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলার জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থায় আঘাত করা হতে পারে।

ইরানের সামরিক নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি আইআরজিসির বিশ্বস্ত কমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসিয়েছেন। নতুন প্রধান মেজর জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়ার বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়াহিদি দাবি করেছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার দাবি করেছেন যে, ইরান যুদ্ধে হেরে গেছে এবং তাদের নৌ-অবরোধের মাধ্যমে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে। তিনি হরমুজ প্রণালিকে আমেরিকার ভূখণ্ড ঘোষণার কথা বললেও হোয়াইট হাউস পরে একে ‘কৌতুক’ হিসেবে দাবি করে। এর জবাবে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ঘোষণা করেছেন, কোনো মার্কিন সেনা ইরানের ভূখণ্ডে পা রাখলে তাকে বন্দি বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে; নারী যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল কিন্তু অপরিপক্ব কৌশলের কারণে পিছিয়ে গেছে। তিনি জানান, জুলাই মাসে মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে বোমাবর্ষণ করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল সড়ক, সেতু, রাডার ও উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করে স্থল হামলার পথ তৈরি করা। তবে রেজাইয়ের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সফল স্থল অভিযানের জন্য অন্তত এক লাখ সৈন্য প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আকরামিনিয়া স্পষ্ট করেছেন যে, বিদেশি কোনো সেনাকে ইরানের মাটিতে পা রাখতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতেও আইআরজিসি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কোনো ধরনের হুমকি বা আল্টিমেটামের কাছে ইরান নতি স্বীকার করবে না। এছাড়া হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চললেও আইনি জটিলতায় তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জাভানি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত পুরোপুরি মেনে চলে, তবেই কেবল হরমুজ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরমাণু কর্মসূচির মতো ইস্যুগুলোকে পরে আলোচনার জন্য রেখে চুক্তিতে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা স্থল হামলা চালানো হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামরিক বিশ্লেষকরা এমন অভিযানের বাস্তবায়ন ও ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের পরই আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা (অফেন্সিভ ডিট্যারেন্স) গড়ে তোলার ঘোষণা আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেজাই জানান, জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের উত্তেজনার সময় মার্কিন বাহিনী তেহরান বা উত্তরাঞ্চলে হামলা করেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য দিয়ে সম্ভব নয়।

শেয়ার করুন