বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সারের এই সংকট যদি চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, তবে দেশে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তার এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে দেশে সারের চাহিদা থাকে ১৩ দশমিক ২১ লাখ টন। গত পরশু পর্যন্ত সরকারি গুদামে ১২ লাখ ৪৫ হাজার টন সার মজুত ছিল এবং ডিলারদের কাছে আরও ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ টন সার থাকার কথা। কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। অনেক স্থানে ডিলাররা এক বস্তার বেশি সার বিক্রি করছেন না, যা কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারীর মতো এলাকায় কৃষকদের সার পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এমনকি ডিলারদের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ইউনিয়নভিত্তিক সারের বরাদ্দ নির্ধারণে কৃষকের প্রকৃত সংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এছাড়া পরিবেশকরা নিয়মিত বিক্রয়কেন্দ্র খোলা না রাখায় এবং প্রশাসন, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, রবি মৌসুমের ফসলের জন্য কৃষকরা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সার কিনছেন বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ বলেই মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে। খোলাবাজারে সার পাওয়া গেলেও পরিবেশকদের কাছে তা না পাওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ডিজেলের ঘাটতি ও বন্যার কারণে বোরো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর আমন ও রবি মৌসুমের ফসল নিয়ে কৃষকরা এমনিতেই শঙ্কিত।
বাংলাদেশ গ্যাসসংকটের কারণে সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই বৈশ্বিক অস্থিরতায় সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে ভর্তুকি দিয়ে কেনা সার যদি অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের কাছে না পৌঁছায়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবশ্যই সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে এবং অসাধু পরিবেশকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কৃষকরা সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পেতে পারেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনিতেই ডিজেলের ঘাটতিতে সেচসংকট ও বন্যার কারণে বোরোর উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর পরিপ্রেক্ষিতে আমনের উৎপাদনে যাতে কোনোভাবে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তবে সেটা যে হয়নি, সার নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা, ভোগান্তি, বিক্ষোভ ও ডিলারদের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহই তার বড় প্রমাণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে যুদ্ধ, মহামারিসহ যেকোনো বৈশ্বিক সংকটেই সারের সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে দেশের অর্থনীতি ও কৃষির ওপর তার প্রভাব পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পরিস্থিতিতে সারসংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
সূত্র: প্রথম আলো








