সরকারি মালিকানাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) আর্থিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে একটি অডিট প্রতিবেদনে। ২০৮ পৃষ্ঠার এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে গত তিন অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনা করে ৯ হাজার ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৫ টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ১৬৪৭ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাওয়ার হাবের মোট ৬টি ইউনিটের হিসাব নিয়ে এই নিরীক্ষা চালানো হয়।
২০২২-২০২৩, ২০২৩-২০২৪ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত এই কমপ্লায়েন্স অডিট সম্পন্ন হয় গত বছরের ২৪ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নিজাম খান চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এই ইন্সপেকশন রিপোর্ট ইস্যু করেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো রিপোর্টে মোট ৪৫টি অডিট মেমোর ভিত্তিতে এই অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং ১০টি সাধারণ অনিয়ম (নন-এসএফআই) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অংকের পরিমাণ ৭ হাজার ৬৯৭ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে বিদ্যুৎ বিক্রয় খাতে। বিপিডিবি’র কাছে বিদ্যুৎ বিক্রয় বাবদ বকেয়া টাকা নির্ধারিত সময়ে আদায় না করায় ৫ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া, প্লান্টের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কোম্পানি ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কারিগরি ও পরিচালনাগত নানা ত্রুটি ও গাফিলতির কারণে বিপুল পরিমাণ টাকা গচ্ছা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (ইস্ট) বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে এবং ২০২৩ সালের মে মাসে ফোর্স শাটডাউন করা হলে ইপিসি ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায় না করে কোম্পানির তহবিল থেকে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি, চুক্তির শর্ত ভেঙে প্লান্টের আউটেজ আওয়ার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেও ১৭১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪১ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ডিফেক্ট সার্ভিস লায়াবিলিটি পিরিয়ডে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বাজেয়াপ্ত না করায় ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯১ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত ইউনিট ১ ও ২ এর বিক্রয়কালে অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন ও স্যালভেজ ভ্যালু নির্ধারণে ত্রুটির কারণে ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতি, চাহিদা ছাড়াই অতিরিক্ত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার কেনায় ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকা ব্যয় এবং পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে আরডিপিপি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা। এছাড়া, পটুয়াখালীর প্রকল্পে পুনর্বাসনের ঘরের ছাদে প্যাটেন স্টোন ও থাই গ্লাসের কাজ না করিয়েই বিল পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ২৯ লাখ ১৭ হাজার ২২৮ টাকা এবং দাপ্তরিক প্রাক্কলিত কমিটি গঠন ছাড়াই চুক্তি স্বাক্ষরের মতো অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক খাতের অনিয়মের মধ্যে রয়েছে পরিবহন পুলে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকা সত্ত্বেও ভাড়ায় গাড়ি ব্যবহার বাবদ ২ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা ব্যয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ না দিয়ে ভাড়া বাবদ ১ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০৫ টাকা ব্যয়। এছাড়া অডিট রিপোর্টে কর্মকর্তাদের সাময়িক আগাম টাকা সময়মতো সমন্বয় না করায় ৭ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৯৮১ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বীমা প্রিমিয়াম ও ভ্যাট বাবদ ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকা এবং নিয়ম বহির্ভূত ভেন্ডর চুক্তির মাধ্যমে ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনিয়ম করা হয়েছে।
এই অডিট রিপোর্ট এবং তাতে উত্থাপিত অসঙ্গতিগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নিজাম উদ্দিন এবং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. সবুর হোসেন জানান, তারা অডিট রিপোর্টটি বিশদভাবে দেখেননি এবং এতে কোনো অনিয়ম বা অসঙ্গতি থাকার বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া অডিট রিপোর্ট ইস্যুকরণ চিঠিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪৫টি অডিট মেমোর বিপরীতে অডিট কর্তৃপক্ষের জবাব ও প্রমাণকের ভিত্তিতে মোট ৪৫টি অনুচ্ছেদে রূপান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যার মধ্যে অনুচ্ছেদ ১ থেকে ৩৫ পর্যন্ত মোট ৩৫টি অনুচ্ছেদকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৬ থেকে ৪৫ পর্যন্ত মোট ১০টি অনুচ্ছেদকে সাধারণ অনুচ্ছেদ (নন-এসএফআই) হিসেবে চিহ্নিত করে চূড়ান্ত অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোম্পানির ৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত ইউনিট ১ ও ২ এর বিক্রয়ে অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন করার সময় স্যালভেজ ভ্যালু থেকে অস্বাভাবিক কম মূল্য হিসাব করায় কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হয় ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের আওতাধীন পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ,ভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দরপত্রের বর্ণিত কাজের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের সঙ্গে ডিপিএম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার ১১৮ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের (ডিএলপি) মধ্যে প্লান্টের আউটেজ আওয়ার চুক্তির শর্তের অধিক হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ আদায় না করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১১১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪১ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্লান্টের অ্যানুয়েল ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি কম ঘোষণা করায় বিদ্যুৎ বিক্রয় বাবদ কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৯ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্লান্টের অনুমোদিত আউটেজ আওয়ারের অতিরিক্ত আউটেজ-এর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কোম্পানির রাজস্ব আয়জনিত আর্থিক ক্ষতি ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ টাকা।
সূত্র: মানবজমিন








