নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামে সুখের সংসার ছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মজিবুর রহমান ওরফে সুখচাঁনের। সৌদিপ্রবাসী মেজ জামাতা ছুটিতে দেশে আসায় তিন মেয়ের পরিবারকে তিনি বাড়িতে দাওয়াতে এনেছিলেন। কিন্তু গত শুক্রবারের এক দুর্ঘটনায় সেই আনন্দ নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। দুপুরের খাবারের পর পরিবারের ছয় সদস্য বাড়ির পাশের শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে তলিয়ে যান। যদিও শিশুসহ মেজ মেয়েকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন মেজ জামাতা ও ছোট মেয়ে। দুর্ঘটনার ৪৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন সুখচাঁনের নাতি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল শুক্রবার থেকেই তৎপর রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নদীর প্রবল স্রোতে যখন পাঁচজন তলিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের বাঁচাতে সৌরভ মিয়া নামের স্থানীয় এক তরুণ নদীতে ঝাঁপ দেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত স্রোতের তোড়ে ডুবে প্রাণ হারান।
ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া সুখচাঁন বলেন, ‘আমি বারবার নিষেধ করেছিলাম নদীতে না নামার জন্য। আমার কথা কেউ শুনল না। বড় মেয়ে আগেই অসুখে মারা গেছেন, তার একমাত্র সন্তান শান্তকে আমিই বড় করছিলাম। সে এবার মাস্টার্স শেষ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেই নাতিই এখন নিখোঁজ। গত বছর ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম, সে-ও নেই। মেজ জামাতার সৌদি ফেরার সময় ঘনিয়ে এসেছিল, কিন্তু তার ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। এই শোক কীভাবে সহ্য করব?’
শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনুর মিয়া জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে মৃতদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিচয় ও উদ্ধারের তথ্য নিচে দেওয়া হলো
- শনিবার সকাল ১০টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮) এবং স্থানীয় তরুণ সৌরভ মিয়া (১৮)-এর মরদেহ উদ্ধার করে।
- দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ছোট মেয়ে শান্তা আক্তারের (২৫) মরদেহ ভেসে ওঠে। শান্তা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ইসমাইল চৌধুরীর স্ত্রী ছিলেন।
- টাঙ্গাইলের বাসিন্দা শান্ত (২৪) নামের আরেক তরুণ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
সুখচাঁনের প্রতিবেশী ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মিন্টু মিয়া জানান, টিনের দোচালা ঘরে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন সুখচাঁন। অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা সুখচাঁনের জীবনে এমন বিপর্যয় নেমে আসবে তা এলাকাবাসী এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার স্বপ্ন দেখা এই বাবা এখন শোকে পাথর হয়ে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিখোঁজের ৪৫ ঘণ্টা পরও এখনো নাতির সন্ধান মেলেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে স্বামী-সন্তান নিয়ে মেজ মেয়ে শাহীনুর চলে আসেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুখচাঁন বলেন, ‘এত কইরা কইলাম, নদীত যাওয়ার দরকার নাই, অন্য কোনোখান থাইক্যা ঘুইরা আসো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়ি থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শত শত স্থানীয় লোক, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা দুঃসময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছোট জামাতার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুমার নামাজের পর সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হেগর ছেলে শান্তরে ছোটত্তে একাই মানুষ করছে।
সূত্র: প্রথম আলো








