থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আটজন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি এড়াতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জনসমক্ষে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কেবল দায়িত্বপালনরত সরকারি কর্মকর্তাদেরই বন্দুক বহনের অনুমতি দেওয়া হবে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা থাদসাকর্ন কোনথং জানিয়েছেন, হামলাকারী ১৪ বছর বয়সী কিশোরটি তার দাদার মালিকানাধীন বন্দুক ও গুলি ব্যবহার করেছে। প্রাথমিক ফরেনসিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিশোরটি তার দাদার শোবার ঘরে রাখা অস্ত্রটি সংগ্রহ করেছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত বন্দুকটি আইনগতভাবে নিবন্ধিত ছিল এবং এটির বৈধ লাইসেন্সও ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ভোর ৫টার দিকে, যখন কিশোরটি তার ৭৩ বছর বয়সী দাদা ও ৭৪ বছর বয়সী দাদিকে তাদের ফ্ল্যাটে গুলি করে হত্যা করে। এরপর সে স্কুলবাসে করে দেবসিরিন স্কুলে পৌঁছায়। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে প্রথম ক্লাসে এবং ৯টা ২০ মিনিটে দ্বিতীয় ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার পর, দ্বিতীয় ক্লাসের মাঝামাঝি সময়ে সে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। সে পাঁচজন শিক্ষককে হত্যার পর নিজেই নিজের প্রাণ কেড়ে নেয়। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
থাইল্যান্ডের জাতীয় পুলিশ প্রধান কিত্তিরাত ফানফেত সাংবাদিকদের জানান, হামলাকারীর নিশানা করার দক্ষতা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। তার ছোড়া গুলিগুলো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে আঘাত করেছিল। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন এই হামলাকে একটি ‘সুপরিকল্পিত’ অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পুলিশ কিশোরটির ইলেকট্রনিক ডিভাইস তল্লাশি করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে ঘটা গোলাগুলির ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করেছে।
কিশোরটির চাচা জানিয়েছেন, সে খুব কমই ঘরের বাইরে বের হতো এবং বেশিরভাগ সময় সহিংস ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকত। পরিবারের সদস্যদের কাছে সে শান্ত ও ভালো আচরণের ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল, তাই এমন নৃশংস হামলার কোনো পূর্বলক্ষণ তারা বুঝতে পারেননি। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর সে তার দাদা-দাদির সঙ্গেই বসবাস করত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে সাধারণ মানুষের কাছে বন্দুক থাকার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখই অবৈধ। যদিও দেশটিতে অস্ত্র রাখার বিষয়ে কঠোর আইন রয়েছে এবং অবৈধভাবে অস্ত্র রাখলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে, তবুও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী আনুতিন অতীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন বন্দুক নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে নতুন লাইসেন্স ইস্যুর ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণ অন্যতম। গতকালের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, এমন ঘটনা ঘটার কথা ছিল না এবং এটি কীভাবে সম্ভব হলো তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দেবসিরিন স্কুলটি থাইল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কূটনীতিক, ক্রীড়াবিদ এবং একাধিক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এই স্কুলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। এমন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কিশোরের এই তাণ্ডব পুরো থাইল্যান্ডকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
বর্তমানে থাই কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে, কিশোরটি ঠিক কী কারণে এমন চরমপন্থার দিকে ঝুঁকেছিল। প্রধানমন্ত্রীর নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণা এখন দেশটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
১৪ বছর বয়সী ওই কিশোর প্রথমে তার বাড়িতে থাকা দাদা-দাদিকে হত্যা করে।
পরে থাই সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গুলিতে আহত এক শিক্ষার্থীরও মৃত্যু হয়েছে।
আনুতিন আরও বলেন, ‘আমি শুধু নিহত ব্যক্তিদের জন্যই দুঃখিত নই, এ ঘটনা ঘটেছে বলেও আমি দুঃখিত।
প্রস্তাবিত আইনে দায়িত্বপালনরত সরকারি কর্মকর্তারাই শুধু বন্দুক বহন করতে পারবেন।
আমাদের দেশে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে?’
তারা দুজন একটি দোতলা ফ্ল্যাটে থাকতেন।
থাই পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দুজনের মাথায় একটি করে গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তাঁরা নিহত হন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাদা-দাদিকে হত্যার পর ওই কিশোর একটি স্কুলবাসে ওঠে।
সূত্র: প্রথম আলো








