বগুড়ায় ৪০০ একর বিসিক শিল্পপার্ক ও রেলপথসহ ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা

প্রকাশ:

শিল্পের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বগুড়ায় ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্পপার্ক নির্মাণ, বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শহরের রেললাইনের ওপর ওভারপাস নির্মাণ, বগুড়া সড়ক জোন স্থাপন, আন্তর্জাতিক ফুটবল স্টেডিয়ামসহ ক্রীড়াগ্রাম এবং করতোয়া নদীর পুনর্জীবনসহ একের পর এক উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও অবহেলা কাটিয়ে বগুড়াসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে এই উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাগুলো উঠে আসে। এই ঘোষণা বগুড়ার ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। শনিবার (৮ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১১টায় বগুড়ার মইন কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি। তিনি বলেন, আমাদের জরিপ অনুযায়ী বগুড়ায় শিল্পের উন্নয়নে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে গত দুই দশকে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ৪০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পপার্ক তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, বগুড়া আমাদের সবার আবেগের জায়গা এবং এ অঞ্চলের শিল্প ও ব্যবসার যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, বগুড়া বাংলাদেশের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জাতীয়তাবাদের জনক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বগুড়ার সন্তান এবং দেশ গঠনে তার অবদান কোনোদিন ভোলার নয়। তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছর বগুড়া নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ বগুড়ার মানুষ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এ অঞ্চলের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ, তাই জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থেই বগুড়ার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বগুড়ার কাছে পুরো দেশ কৃতজ্ঞ থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বগুড়ার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বগুড়া একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা এবং এখানে উৎপাদিত পণ্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজার তৈরি করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতদিন অবহেলিত থাকলেও এখন বৈষম্যহীন বাংলাদেশে বগুড়ার ঘাটতি পূরণ করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন করা হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এছাড়া ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে বগুড়া বিমানবন্দর অভ্যন্তরীণ রুটে চালুর চেষ্টা চলছে এবং আগামী মাস থেকে ড্রোন তৈরির কারখানার কাজ শুরু হবে।

শহরের যানজট নিরসনে রেললাইনের ওপর ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এতে শহরের যানজট অনেকটাই কমে আসবে। করতোয়া নদীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে একসময়ের খরস্রোতা করতোয়া নদীতে আবারও প্রাণ ফিরে আসছে। ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বগুড়ার তিনমাথায় আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়ামসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ক্রীড়াগ্রাম নির্মাণ করা হবে। বগুড়ার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বগুড়ার ওপর দিয়ে ১৩টি জেলার মানুষ যাতায়াত করে। কৃষি ও শিল্পসহ সবদিক থেকেই বগুড়া সমৃদ্ধ, অথচ গত ২০ বছর বগুড়ার নাম শুনলেই নানা অবহেলা করা হয়েছে। এখন সেই চিত্র বদলে দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন, বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ, বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম এবং বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আতিকুর রহমান বাদলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের পর যোগাযোগমন্ত্রী বগুড়া শহরের সঙ্গে পূর্ব বগুড়ার যোগাযোগের একমাত্র শাহ ফতেহ আলী সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা, জেলা বিএনপির সকল নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এই উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বগুড়া শুধু উত্তরাঞ্চলের নয়, বরং সারা দেশের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে স্থানীয় সুধীজন আশা প্রকাশ করছেন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বগুড়াকে একটি আধুনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা। তারা মনে করেন, বিসিক শিল্পপার্ক এবং রেলপথের মতো প্রকল্পগুলো বগুড়ার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

শেয়ার করুন