আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন মেসি: এক নজরে তার অর্জনের ঝুলি

প্রকাশ:

২০০৫ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলার পর ৩৯ বছর বয়সে এসে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হারের মধ্য দিয়ে। তবে বিদায়বেলায় তিনি পেছনে ফেলে গেছেন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে তিনি কেবল আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারই নন, বরং বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সব বড় শিরোপাই নিজের শোকেসে তুলেছেন।

মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বসেরার মুকুট এনে দেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জেতেন এই মহাতারকা। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি ছয়টি আসরে অংশ নিয়ে মোট ২১ গোল করেছেন এবং ১২টি অ্যাসিস্ট করেছেন, যা এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের ফাইনালসহ বিশ্বকাপে তার মোট ম্যাচ সংখ্যা ৩৩টি।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির শিরোপা খরা কাটে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। ব্রাজিলের মারাকানায় স্বাগতিকদের হারিয়ে ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা উপহার দেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকার ইতিহাসে ৩৯ ম্যাচ খেলা মেসি সাতটি আসরে অংশ নিয়ে মোট ১৪ গোল করেছেন। এছাড়া ২০২২ সালে ওয়েম্বলিতে ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালিসিমা শিরোপাও জিতে নেন তিনি, যেখানে মেসি দুটি গোলে সহায়তা করেছিলেন।

মূল জাতীয় দলের বাইরে বয়সভিত্তিক পর্যায়েও মেসির সাফল্য ঈর্ষণীয়। ২০০৫ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতান এবং একই সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতে দেশের জার্সিতে নিজের সাফল্যের ধারা বজায় রাখেন।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে মেসি এখন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। তার এই গোল সংখ্যা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার (৫৬ গোল) চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া দিয়েগো ম্যারাডোনা করেছেন ৩৪ গোল। ম্যাচ খেলার দিক থেকে মেসির পরে আছেন হ্যাভিয়ের মাচেরানো (১৪৭ ম্যাচ)।

মেসির ক্যারিয়ারের পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০১৪ সালে তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। সেবার তিনি গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। এছাড়া ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ফাইনাল হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল তার। বিশেষ করে ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর তিনি সাময়িকভাবে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন, যা পরে প্রত্যাহার করে নেন।

অধিনায়ক হিসেবে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার সোনালি অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সাল থেকে। এরপর থেকে টানা চারটি বড় শিরোপা—কোপা আমেরিকা (২০২১ ও ২০২৪), ফাইনালিসিমা (২০২২) ও বিশ্বকাপ (২০২২) জিতে আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার (২০১৪ ও ২০২২) গোল্ডেন বল জয়ের অনন্য রেকর্ডও তার দখলে।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান এক নজরে: ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, ৬টি বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ, ২১ বিশ্বকাপ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট। এছাড়া তার ঝুলিতে রয়েছে বিশ্বকাপ (২০২২), দুই কোপা আমেরিকা (২০২১, ২০২৪), ফাইনালিসিমা (২০২২), অলিম্পিক স্বর্ণ (২০০৮) ও অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ (২০০৫)।

মেসির এই বিদায় কেবল একজন ফুটবলারের অবসর নয়, বরং আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক যুগের সমাপ্তি। সমালোচনার মুখে পড়েও যিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিকসহ সম্ভাব্য সব বড় সম্মান জিতে মাঠ ছাড়লেন, তার এই প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালসহ তিনি বিশ্বকাপে মোট ৩৩ ম্যাচ খেলেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপেও প্রায় একক নৈপূন্যে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে তুলে আনেন মেসি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা শিরোপা জয় করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফাইনালিসিমা জয় ২০২২ সালে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে ফাইনালিসিমা জয়েও আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দেন মেসি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার ১২৫ গোল আর্জেন্টিনার আর কোনো খেলোয়াড়ের কাছাকাছিও নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফেরেন।

শেয়ার করুন