জাতিসংঘে ইরান: নতুন কূটনৈতিক কৌশলে তেহরানের বার্তা

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার মুখে ভয়াবহ সংকটের সাত মাস পর ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিকরা এবার নিউ ইয়র্কের রাজপথে দেখা দিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিশ্বমঞ্চে ইরানের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন, তখন তার মৃত্যুর শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজকের এই কূটনৈতিক সফর সেই অনিশ্চিত পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা যুক্তরাষ্ট্র-সমন্বিত ইসরাইলি বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফেরার সাত মাস পর, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের সুরক্ষাবলয়ে ম্যানহাটনের রাস্তায় হেঁটেছেন। বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে পেজেশকিয়ান পশ্চিমা সাংবাদিক ও থিংক-ট্যাংক বিশ্লেষকদের সঙ্গে বসে তার সরকারের চিন্তাধারা তুলে ধরেন। অতীতের দশকগুলোতেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের অংশগ্রহণ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যারা তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেই দেশে সফর করার সিদ্ধান্তকে তারা ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবেই দেখেছিল।

নিউইয়র্কে অবস্থানকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি দুই ডজনেরও বেশি বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে ইউরোপের ১০টির বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিনিধিরা ছিলেন। এমনকি জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদির সঙ্গেও তিনি আলোচনায় বসেছেন, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান জর্ডানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আরাগচির সরাসরি বৈঠককে। তিন মাস ধরে থমকে থাকা কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালুর উদ্দেশ্যেই এই বৈঠক আয়োজন করা হয়েছিল।

আরাগচি পরবর্তীতে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে। প্রস্তাবটি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন যদি ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, তবে তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে, যা চূড়ান্ত সমঝোতার পথ প্রশস্ত করবে। এদিকে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইরান কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না। তার এই বক্তব্য দেশের ভেতরের কট্টরপন্থী মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে, যদিও এই সফরের বিরোধী পক্ষ যুদ্ধের সময় এমন উদ্যোগকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘের সমাবেশে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই মাথা নত করবে না।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা এই সফর নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠকের কারণে ইব্রাহিম রেজাইয়ের মতো কট্টরপন্থীরা আরাগচির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ তিনি পররাষ্ট্রনীতির এই পদক্ষেপকে হঠকারী বলে সমালোচনা করেছেন এবং কোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শত্রুপক্ষের সঙ্গে এই আলোচনা হয়েছে, তার ব্যাখাও চেয়েছেন। তবুও এসব ঝুঁকির পরও তেহরানের কর্মকর্তারা অত্যন্ত কৌশলী পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সফর সম্পন্ন করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের টিকে থাকার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় মহলের মনোযোগের কথা মাথায় রেখেই তেহরানের কর্মকর্তারা অত্যন্ত কৌশলী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সফরটি আয়োজন করেছিলেন। পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কোনোভাবেই হঠকারিতার বিষয় নয়, গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এমনটাই লিখেছেন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজাই।

জাতিসংঘের মঞ্চে ইরানের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেতানিয়াহু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন নিউ ইয়র্কের রাস্তায় সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং জাতিসংঘের অনেক প্রতিনিধিই প্রতিবাদস্বরূপ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যে এবারের জাতিসংঘ সফর ইরানের জন্য কেবলই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নয়, বরং বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে যুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যে এবারের সফরটিই হয়ে উঠেছে প্রধান আলোচনার বিষয়।

শেয়ার করুন