ইয়েমেনের চলমান লড়াই কেবল স্থানীয় কোনো বিরোধ নয়, বরং এটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, সমুদ্রপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের একটি বড় লড়াই। হুতি বিদ্রোহীদের মোকা শহরে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে ধুবাবে তাদের অবস্থানের বিষয়টি এখন কেবল একটি শহর দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালির ইয়েমেনি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মোকা দখলের কারণে তায়েজ এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথগুলো ব্যাহত হয়েছে। এই সামরিক সাফল্যে ইরান ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক প্রভাব যেমন বেড়েছে, তেমনি এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের জন্য শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ধুবাবে হুতিদের উপস্থিতি বাব আল-মানদেবের ওপর তাদের নজরদারি ও হুমকি প্রদানের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ৩ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনের সংঘর্ষে অন্তত ২৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতির পেছনে ইয়েমেনের সরকারবিরোধী পক্ষগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং হুতিদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হুতিবিরোধী বাহিনী মোকা ও ধুবাবের মতো এলাকা থেকে পিছু হটলেও এটি কেবল কৌশলগত পুনর্গঠন হতে পারে, তবে এর রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য অত্যন্ত চড়া।
হুতিদের এই অগ্রযাত্রা মোকাবিলায় সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিভাজন একটি বড় বাধা। ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স, বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনীর লক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় একটি ঐক্যবদ্ধ কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। রিয়াদ ও আবুধাবিরও ইয়েমেন নিয়ে নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা রয়েছে, যা চলমান যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এবং তাদের নির্ভুল হামলার কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে স্পষ্ট হলেও, সৌদি আরব সেই শিক্ষা থেকে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারেনি। রিয়াদ এখন হুতিদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে বাব আল-মানদেবের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সরাসরি হস্তক্ষেপের দিকে ঝুঁকছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানালেও, ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
এই সহায়তা সৌদি আরবকে ইয়েমেন যুদ্ধের একদম শুরুর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তারা এখন এক প্রকার অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি। ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কেবল নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, যা রিয়াদের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ। এর ফলে সৌদি আরবকে হয়তো অতীতের মতোই অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হতে পারে, বিশেষ করে যদি হুতিরা তাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত করে বসে।
মূল প্রশ্ন এখন কেবল হুতিদের সামরিক শক্তি দমন নয়, বরং হুতিবিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক ঐক্য ফিরিয়ে আনা। গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্যও এই যুদ্ধ পরিস্থিতি বড় পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাব আল-মানদেবের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ইরান যেভাবে তেল রপ্তানির নিরাপদ পথে চাপ সৃষ্টি করছে, তাতে রিয়াদ তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরিশেষে, হুতিদের সামনেও এখন বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তাদের সরবরাহ পথ দীর্ঘ হওয়ায় তারা পাল্টা বিমান হামলা, সমুদ্র অভিযান ও স্থানীয় বা বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপের মুখে পড়তে পারে। মোকা বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলা হুতিদের জনবল ও গোলাবারুদ মজুত করার সক্ষমতাকে খর্ব করার একটি প্রয়াস। এখন যুদ্ধের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে লোহিত সাগর ও সংলগ্ন সমুদ্রপথের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার বড় কৌশলগত পরিকল্পনাও যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইয়েমেনের যুদ্ধকে শুধু স্থানীয় সংঘাত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মোকা শহর ও উপকূলের কাছের দ্বীপগুলো তাই শুধু একটি শহর দখলের বিষয় নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতির হামলায় মক্কা চুক্তি কি কার্যকর হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিস্থিতি তিনটি দিক থেকে দেখা দরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্বিতীয়ত, বাব আল-মানদেবের কাছের উপকূল ব্যবহার করে সমুদ্রবাণিজ্য, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরিতে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তৃতীয়ত, ইরান তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংঘাতে বাব আল-মানদেবকে কতটা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিরা ইতিমধ্যে হোদেইদার দক্ষিণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে।
সূত্র: প্রথম আলো








