আজ ৫ সেপ্টেম্বর জনপ্রিয় অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠির জন্মদিন। ৫০ বছরে পা দিলেন ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’, ‘নিউটন’, ‘মাসান’, ‘মিমি’, ‘স্ত্রী’ ও ‘মির্জাপুর’-এর মতো দর্শকপ্রিয় সিনেমা ও সিরিজের এই তারকা। জন্মদিনের ঠিক আগের দিনই মুক্তি পেয়েছে তাঁর আলোচিত সিনেমা ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বড় পর্দা থেকে ওটিটি—সবখানেই নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন তিনি।
পঙ্কজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলায় তাঁর ইচ্ছা ছিল, বাবা বাড়িতে একটি ট্রাক্টর কিনবেন এবং তিনি পড়াশোনা শেষ করে সেই ট্রাক্টর দিয়ে খেতখামারের কাজ করবেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে চিকিৎসক হোক, তাই তিনি পঙ্কজকে পড়াশোনায় মন দিতে বলেন। বাবার কথা মেনে বিহারের গোপালগঞ্জ থেকে পাটনায় পাড়ি জমান পঙ্কজ। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর জীবনের লক্ষ্য বদলে যায়। ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনের পাশাপাশি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। এক অনুষ্ঠানে মজা করে তিনি বলেছিলেন, ‘ডক্টর’ হতে এসে তিনি ‘অ্যাক্টর’ হয়ে গেছেন। এখন তাঁর উপলব্ধি, সেই ট্রাক্টর না পাওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের আশীর্বাদ, যা তাঁকে অভিনয়ের পথে নিয়ে এসেছে।
পাটনায় পড়াশোনার সময় অভিনয়ের টানে স্নাতক শেষ না করেই নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন পঙ্কজ। জীবন চালানোর জন্য তিনি হোটেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দুই বছরের একটি কোর্স করেন এবং একটি হোটেলে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। দিনের বেলা হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করে রাতে নাটকের মহড়ায় যেতেন। কখনো কখনো রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত রান্নাঘর পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করতেন। চাকরির চেয়ে অভিনয়ের প্রতি বেশি ঝোঁক থাকায় হোটেলের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে প্রায়ই বকুনি শুনতে হতো তাঁকে।
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার লক্ষ্যে পঙ্কজ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় ভর্তির চেষ্টা করেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনে তিনি পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফিরে স্নাতক সম্পন্ন করেন। দুইবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তৃতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভারতের এই মর্যাদাপূর্ণ নাট্যবিদ্যালয়ে সুযোগ পান এবং ২০০৪ সালে পড়াশোনা শেষ করেন। একই বছর স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠিকে নিয়ে মুম্বাই পাড়ি জমান। শুরুতে কোনো পরিচিতি না থাকায় অডিশনের জন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে। টেলিভিশন প্রযোজনায় বারবার পুলিশের চরিত্রে ডাক পেতেন তিনি। একসময় ভেবেছিলেন, নিজের জন্য একটি পুলিশের পোশাক বানিয়ে রাখবেন।
অনুরাগ কাশ্যপের ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’-এ সুলতান কুরেশির চরিত্র তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ‘মাসান’, ‘নিউটন’, ‘বরেলি কি বরফি’, ‘ফুকরে’, ‘লুডো’, ‘মিমি’, ‘ওএমজি ২’, ‘স্ত্রী’ এবং ‘মির্জাপুর’-এর কালিন ভাইয়া চরিত্র তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। পঙ্কজের মতে, ‘মির্জাপুর’ সিরিজের সাফল্যের পর থেকেই তাঁকে ‘স্টার কাস্ট’ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়।
অভিনয় নিয়ে পঙ্কজ অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। নিজের অভিনীত সিনেমা খুব একটা দেখেন না, কারণ দেখতে বসলেই ভুলত্রুটি খুঁজতে শুরু করেন। নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক হিসেবে তিনি স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠির কথা উল্লেখ করেন, যিনি সরাসরি তাঁর অভিনয়ের সমালোচনা করেন। এমনকি শট দেওয়ার পর মনিটরে নিজের অভিনয় দেখার প্রয়োজনও বোধ করেন না তিনি; পরিচালকের সন্তুষ্টিকেই তিনি চূড়ান্ত মনে করেন।
কাজের চাপের কারণে একটি চরিত্র থেকে অন্যটিতে যাওয়ার সময় পঙ্কজকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনীভিত্তিক ‘ম্যায় অটল হুঁ’র শুটিং শেষে সরাসরি ‘স্ত্রী ২’-এর সেটে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথম শটের পর পরিচালক অমর কৌশিক তাঁকে জানান, পর্দায় তাঁকে ‘স্ত্রী’র রুদ্র নয়, অটল বিহারি বাজপেয়ীর মতো লাগছে। এই অভিজ্ঞতার পর পঙ্কজের উপলব্ধি, নতুন চরিত্রে যাওয়ার আগে একজন অভিনেতার অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিনের বিরতি প্রয়োজন।
পঙ্কজ ত্রিপাঠি দীর্ঘ ১৫ বছর পর গীতিনাট্য ‘লা-ইলাজ’-এর মাধ্যমে মঞ্চে ফিরেছেন। নাটকটি প্রযোজনা করেছেন তাঁর স্ত্রী মৃদুলা এবং এতে তাঁদের মেয়ে আশি ত্রিপাঠিরও অভিনয়ে অভিষেক হয়েছে। পঙ্কজ জানিয়েছেন, তিনি মেয়ের পথ সহজ করে দিতে চান না এবং ‘পঙ্কজ ত্রিপাঠির মেয়ে’ পরিচয়ে কোনো বাড়তি সুবিধা পাওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি।
বহু বছর আগে পাটনার যে হোটেলে তিনি বাবুর্চির সহকারী হিসেবে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতেন, সম্প্রতি সেখানে অতিথি হিসেবে ফিরেছিলেন তিনি। এবার তাঁর জন্য হোটেলের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয় এবং মহাব্যবস্থাপক তাঁকে স্বাগত জানান। সেই মুহূর্তটি তাঁকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর মনে হয়েছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে জীবনে সত্যিই অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোনো ছবিতে ছোট্ট চরিত্রে এলেও আলাদা করে মনে থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্রামের চেনা পরিবেশেই কেটে যাবে তাঁর জীবন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কে জানত, না পাওয়া সেই ট্রাক্টরই একদিন তাঁকে হিন্দি সিনেমার পথে নিয়ে যাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খেতখামারের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাবা ছেলেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বললেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মঞ্চ, মহড়া ও অভিনয়ের জগৎ তাঁকে এমনভাবে টানল যে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে ট্রাক্টর না পাওয়ায় একসময় কষ্ট পেয়েছিলেন, বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সেটিকেই আশীর্বাদ বলে মনে হয়েছে পঙ্কজের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর উপলব্ধি, সব অপূর্ণতা শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনে না; কোনো কোনো না-পাওয়া মানুষকে তার আসল গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেয়।
সূত্র: প্রথম আলো








