ওমরাহ পালন শেষে মক্কার আল-সাফা রাজপ্রাসাদের দরবারকক্ষে মিলিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সেখানে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তাঁদের আতিথেয়তা জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এই শীর্ষ বৈঠকের ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট তিন দেশ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘মক্কা চুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র আদলে গড়া একটি সামরিক জোটের সূচনা বলে বর্ণনা করছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন দেশের মধ্যে কোনো একটি আক্রান্ত হলে অন্য দুটি দেশ তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে, যা অনেকটা ন্যাটোর পঞ্চম ধারার অনুরূপ। যদিও চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর দাবি, এটি কেবল আত্মরক্ষামূলক একটি উদ্যোগ এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত নয়। তবে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি।
ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে ইরান এই অঞ্চলে প্রভাবশালী এবং তেহরানের শিয়া সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে সৌদি আরবসহ অন্যান্য সুন্নিপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে গভীর সন্দেহ বিদ্যমান। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন এই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু পারস্পরিক আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। এর আগে ১৯৮১ সালে ইরানকে বাদ দিয়েই সৌদি আরবের উদ্যোগে জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল, যা ছিল মূলত ইরানের প্রভাব মোকাবিলার একটি প্রয়াস।
নিরাপত্তার প্রশ্নে উপসাগরীয় দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে কুয়েত সংকটের সময় এবং সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় রিয়াদের সেই আস্থায় ফাটল ধরেছে। ফলে সৌদি আরব এখন আর এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং এবারের মক্কা চুক্তি সেই কৌশলেরই অংশ। এর সঙ্গে মিসরকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি সৌদি আরব, মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে ‘আর ফোর’ বা ‘রিজিওনাল ফোর’ নামে একটি আলাদা সামরিক-রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান। চলতি বছরের মার্চ মাসে রিয়াদে এই চার দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কা চুক্তি ও আর ফোর—উভয় উদ্যোগেরই মূল লক্ষ্য সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে রিয়াদ তার জ্বালানি সাম্রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাচ্ছে; বরং ওয়াশিংটন এই নতুন জোটকে নিজেদের মিত্র হিসেবেই দেখছে, যেখানে জোটের ব্যয়ভার বহনের দায়ভার এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থাকবে না।
চুক্তির বিষয়ে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যা তেহরানের নজর এড়ায়নি। যদিও চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলছে এটি ইরানবিরোধী নয়, তবে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ইসলামি জোট সফল হতে হলে তা অবশ্যই ‘ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সুন্নি দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই জোটের কৌশলগত লক্ষ্য যে ইরান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে লোহিত সাগরে সৌদি উদ্যোগে গঠিত ১৪ দেশের নতুন ‘মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’-এও ইরানকে রাখা হয়নি, যা তেহরানকে আরও একঘরে করার ইঙ্গিত দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মক্কা চুক্তি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইরান এবং ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করছে। কাগজে-কলমে এটি রক্ষণাত্মক চুক্তি হিসেবে দাবি করা হলেও, এর কৌশলগত বিন্যাস ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস বলেই প্রতীয়মান হয়। হাসান ফেরদৌসের মতে, এই জোটের মূল লক্ষ্য যে ইরান, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম।
৭ আগস্ট দুপুরে এই তিন নেতা যে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করলেন, কোনো কোনো ভাষ্যকার তাকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সূচনা বলে অভিহিত করেছেন।
সম্পর্কের এতটাই অবনতি হয়েছিল যে ২০১৬ সালে রিয়াদ ও তেহরান কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
ইসলামিক বিপ্লবের দুই বছরের মাথায়, ১৯৮১ সালে সৌদি উদ্যোগে উপসাগরের ছয়টি দেশ একজোট হয়ে জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল গঠন করে।
এক দিন আগেই আঙ্কারা থেকে পৌঁছেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।
হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আহলান ওয়া সাহলান।’
তিনটি মুসলিম দেশ ইতিমধ্যেই নানাভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
আত্মরক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয় তখনই, যখন কোনো দেশ বাইরের কোনো শক্তির আক্রমণের আশঙ্কা করে।
প্রশ্ন হলো, মক্কা চুক্তির দেশগুলো কোন বহিরাগত শক্তিকে ভয় পাচ্ছে?
চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে।
এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশেই উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী থাকায় তেহরানের শিয়া সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের প্রকাশ্য সন্দেহ আছে।
এটিও একধরনের প্রতিরক্ষা জোট, যদিও অভিন্ন প্রতিরক্ষার পাশাপাশি সমন্বিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও এর অন্তর্ভুক্ত।
এই জোটে উপসাগরের সবাই আছে, নেই কেবল ইরান।
১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে ভীতসন্ত্রস্ত দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়।
বিনিময়ে যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তারা আশা করেছিল, চলতি ইরান যুদ্ধের সময় তা অনেকটাই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইরানি আক্রমণে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেখানকার কিছু সেনা ও সরঞ্জাম জর্ডান ও ইসরায়েলে সরিয়ে নিতে হয়।
নিরাপত্তার ভার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে সৌদি আরব যে স্বস্তি আশা করেছিল, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধেই সেই ভরসায় প্রথম বড় ফাটল ধরে।
২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
প্রক্রিয়াটি এখানেই থামবে না; অচিরেই এই তিন দেশের সঙ্গে মিসরও যুক্ত হতে পারে।
এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আরও কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে।
রিয়াদের চোখে তার জ্বালানি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এমন ব্যবস্থা অপরিহার্য।
এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগর থেকে বিদায় করা হচ্ছে।
এই ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের বিস্তৃত প্রতিরক্ষাশিল্প।
অর্থ জোগানোর দায়িত্ব, বলা বাহুল্য, নেবে রিয়াদ।
তাই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নতুন জোটকে নিজেদের পক্ষের শক্তি হিসেবেই দেখছেন।
পার্থক্য হলো, এর ব্যয় আর যুক্তরাষ্ট্রকে একা বহন করতে হবে না।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক চুক্তি, যা যৌথ প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু দুই যোগ দুই চার হিসাব করলে এই চুক্তিকে অতটা নিরীহ মনে হয় না।
যাঁরা মক্কা চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ ভেবে স্বাগত জানিয়েছেন, এই ব্যাখ্যা তাঁদের মনঃপূত হবে না।
অন্তত এমনটি ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সত্যিই যদি তা হয়, তাহলে এই জোটে ইরানের আপত্তি থাকার কথা নয়।
তবে একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে তেহরান বলেছে, ইসলামি জোটটিকে সফল হতে হলে ‘ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ (কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড ইনক্লুসিভ) হতে হবে।
প্রায় একই সময়ে লোহিত সাগরে নৌ চলাচল অবাধ ও নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে সৌদি উদ্যোগে একটি স্বতন্ত্র ‘মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠিত হয়েছে।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ এই যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








