রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সীমান্তে প্রথম সড়ক সেতু চালু, কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশ:

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া তাদের অভিন্ন সীমান্তে প্রথমবারের মতো একটি সড়ক সেতু চালু করেছে। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুটি রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের খাসান এবং উত্তর কোরিয়ার তুমাঙ্গাংকে তুমেন নদীর ওপর দিয়ে সংযুক্ত করেছে। সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটির উদ্বোধন করা হয়, যা মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা সম্পর্কের সর্বশেষ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, নতুন এই অবকাঠামো দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। একইসঙ্গে এটি পর্যটন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মিশুস্তিনের মতে, সীমান্তবর্তী পরিবহন ব্যবস্থার এই সম্প্রসারণ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

নতুন এই সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে সোভিয়েত কর্মকর্তা ইয়াকভ নোভিচেঙ্কোর নামে, যিনি উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল-সুংকে হত্যাচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। উদ্বোধনের পর উভয় দেশের যানবাহনের বহর সেতুটি দিয়ে চলাচল শুরু করে। এর আগে তুমেন নদীর ওপর একটি রেলসেতু এবং ভ্লাদিভস্তক-পিয়ংইয়ং আকাশপথই ছিল দুই দেশের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

তবে এই নতুন সড়ক সংযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে ইউক্রেনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ট্রুথ হাউন্ডস’-এর আশঙ্কা, এই সেতুটি ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার সেনা, নির্মাণশ্রমিক ও সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়ায় পাঠানোর একটি গোপন করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে রাশিয়া থেকে প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সামগ্রী উত্তর কোরিয়ায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এটি কৌশলগত সুবিধা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে অভিযান চালালে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার পক্ষে কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করে। এর বিনিময়ে রাশিয়া পিয়ংইয়ংকে বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, ড্রোন এবং গোয়েন্দা স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছে।

সামরিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও পর্যটন খাতেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া রুশ পর্যটকদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর দেশটির সমুদ্রসৈকত ও স্কি রিসোর্টগুলোতে হাজার হাজার রুশ নাগরিক ভ্রমণ করেছেন। দুই দেশের কর্তৃপক্ষই এখন উত্তর কোরিয়াকে রুশ পর্যটকদের জন্য একটি নতুন গন্তব্য হিসেবে প্রচার করছে।

রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা নিয়ে খোদ মস্কোর ভেতরেও মাঝে মাঝে প্রশ্ন উঠছে। গত মাসে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, রাশিয়া কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাল যেখানে তাদের মিত্র হিসেবে কেবল উত্তর কোরিয়া ও ইরান অবশিষ্ট রয়েছে। জবাবে লাভরভ এই বক্তব্যের ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।

এদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান নিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যেও অস্বস্তি বাড়ছে। গত জুলাই মাসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ জানান, অনেক দেশের নেতাই তাকে প্রশ্ন করছেন—রাশিয়া কেন এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তোকায়েভ সরাসরি পুতিনকে বলেন, এই সংঘাতের প্রকৃতি অনেকের কাছেই, এমনকি কাজাখস্তানের কাছেও, পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

শেয়ার করুন