হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে দোটানায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

প্রকাশ:

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে ধোঁয়াশায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সৌদি আরবের তরফ থেকে এ বিষয়ে সহায়তার জোরালো আবেদন আসার পর থেকেই তিনি বড় ধরনের উভয়সংকটে পড়েছেন। বিষয়টি সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য একটি জটিল সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যেখানে ইরানের সঙ্গে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান মিত্র সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করে দ্রুত মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। হোয়াইট হাউসের প্রেস অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের এই আলোচনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেবল জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, তার আওতায় মিত্রদের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলেন যে তিনি ইয়েমেনে হুতিদের লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর পক্ষে নন। কিন্তু যুবরাজ সালমানের সঙ্গে আলোচনার পরপরই তিনি সুর পাল্টে পেন্টাগনকে বিমান হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে রোববার দুপুরের দিকে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, হামলা চালানোর জন্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি যুদ্ধবিমানগুলোতে অস্ত্র লোড করার কাজ চললেও শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। আপাতত মার্কিন বিমান হামলা হচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের এই দোটানা মূলত ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতার প্রতিফলন। একদিকে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে তারা মার্কিন জাহাজগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকতে সম্মত হয়েছে। ফক্স নিউজের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, তিনি পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বেশিরভাগ উপদেষ্টাই সৌদির হয়ে এ ধরনের যুদ্ধে জড়ানোর ঘোর বিরোধী, বিশেষ করে যখন ইরানের সঙ্গে সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

অতীতের সামরিক অভিজ্ঞতাগুলোও ট্রাম্পকে সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। ২০২৫ সালের বসন্তে লোহিত সাগরে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী টানা ৫০ দিনের বেশি সময় ধরে হুতিদের ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল। ওই অভিযানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড রাডার সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রসহ এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। কিন্তু অভিযানে অকার্যকর প্রমাণিত হওয়া ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার ফলাফল নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকরা বরাবরই সন্দিহান।

ওই অভিযানের সময় হুতিদের পাল্টা আক্রমণে বেশ কিছু আমেরিকান ড্রোন ধ্বংস হয়েছিল। এ ছাড়া অভিযানের খরচও ছিল আকাশচুম্বী; কেবল প্রথম মাসেই প্রায় এক শ কোটি ডলার সমমূল্যের গোলাবারুদ ব্যয় হয়। অপারেশন চলাকালে ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যের দুটি ‘এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট’ যুদ্ধবিমান ভুলবশত বিমানবাহী রণতরি থেকে সাগরে পড়ে যাওয়ার মতো বিব্রতকর ঘটনাও ঘটেছিল।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো গ্রেগরি জনসেনের মতে, ইয়েমেনের হুতি-বিরোধী জোট মূলত বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর এক জোড়াতালি দেওয়া কাঠামো। তাদের মধ্যে হুতি বিরোধিতার চেয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই প্রকট, যার ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান চালানো কঠিন। বর্তমান ও সাবেক অনেক কমান্ডার মনে করেন, সীমিত মাত্রার মার্কিন বিমান হামলা হুতিদের আলোচনার টেবিলে ফেরাতে কিংবা তাদের দাবি থেকে সরাতে সক্ষম নয়।

সৌদি আরব এর আগেও তাদের স্বার্থ রক্ষায় কিছুটা কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে। গত মে মাসে মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাংকার পাহারার মার্কিন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জর্জরিত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে একটি নতুন ফ্রন্ট খোলা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের ঝঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা ছড়িয়ে দিলেও প্রায় সাত মাস ধরে চলমান এই সংঘাত তিনি শেষ করতে পারেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা এ কথা বলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অভিযানের জন্য নির্ধারিত মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোতে সেনারা বোমা তুলছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিদের প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট জানান, আমেরিকা এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই টালমাটাল পরিস্থিতি মূলত সেই গ্যাঁড়াকলকেই ফুটিয়ে তোলে—যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর সৌদি কর্মকর্তারাও দেখিয়ে দিয়েছেন যে মার্কিন সহযোগিতা না পেলে তাদের যতটুকু প্রভাব প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে, তা তারা ব্যবহারে প্রস্তুত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যোগ দিত, তবে তা হতো ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর একটি নতুন পরিকল্পিত স্থল অভিযানের সঙ্গে যৌথ অভিযান।

শেয়ার করুন