এআই চাকরি কেড়ে নেবে না, বরং বাড়াবে উৎপাদনশীলতা

প্রকাশ:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন ব্যাপক শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে এটি মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নেবে, তখন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও গবেষক সানি মো. আশরাফ খান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র দেখছেন। তাঁর মতে, এআইকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা বাংলাদেশের বিশাল কর্মশক্তিকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং বহুগুণ বেশি উৎপাদনশীল করে তুলবে। ২০০৮ সালে ইনফ্রাটেক কনসালট্যান্টস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা এই উদ্যোক্তা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সানি মো. আশরাফ খান মনে করেন, এআই নিয়ে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন না হলেও প্রযুক্তির বিবর্তন সবসময়ই কাজের ধরণ বদলে দেয়। তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের কর্মশক্তিকে এআই-সক্ষম করে তুলতে পারি, তবে একজন কর্মী যিনি বর্তমানে চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন, তিনি ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন। একজন দক্ষ এআই-ব্যবহারকারী কর্মী আগে যে কাজটি করতে ৫ বা ১০ জনের প্রয়োজন হতো, তার সিংহভাগ একাই করতে সক্ষম হবেন।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩২ হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরণের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার এবং ৯ হাজারের কাছাকাছি তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী রয়েছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ১ হাজারের বেশি স্টার্টআপকে সহযোগিতা এবং ৩ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই নারী।

প্রশিক্ষণলব্ধ তরুণদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ১ হাজার ৬০০ তরুণের মধ্যে ৮৫ শতাংশ বাড়িতে বসেই কর্মসংস্থান পেয়েছেন। ৯০ শতাংশেরও বেশি তরুণ কাজের সন্ধানে শহরে স্থানান্তর হওয়ার প্রয়োজন থেকে রেহাই পেয়েছেন এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছেন। তিনি ডিজিটাল দক্ষতায় সমৃদ্ধ ১ হাজার ৬০০ তরুণের ওপর ভিত্তি করেই এই তথ্য তুলে ধরেন।

এআই-সক্ষমতা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, ভবিষ্যতে ডিজিটাল দক্ষতা সব পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। একজন দর্জি যেমন এআই ব্যবহার করে পোশাকের নকশা ও বাজার বিশ্লেষণ করতে পারবেন, তেমনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা, হিসাব এবং বিপণনসহ বিভিন্ন জটিল কাজ সহজ করতে পারবেন। শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানের মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে এআই-নির্ভর ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী কী শিখল বা কী তৈরি করতে পারল, সেটিই মুখ্য হবে।

এজেন্টিক এআই বা এমন প্রযুক্তির কথা তিনি বলেছেন যা মানুষের সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী জটিল সব কাজ যেমন কোড লেখা, ছবি বানানো বা বিশ্লেষণের ধাপগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে। তাঁর মতে, এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের ভয় পাওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন তরুণদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেয়া, যেন তারা এআইয়ের ভুল তথ্য ও প্রতারণা শনাক্ত করতে পারে।

ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্সের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সানি মো. আশরাফ খান বলেন, এটি এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে তরুণরা বাংলাদেশেই অবস্থান করে বিদেশের প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন ব্যক্তি ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবেন, যা পুরো পরিবারের আর্থিক অবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

পরিশেষে তিনি বলেন, এআই বা এজেন্টিক এআইয়ের যুগে বাংলাদেশ যদি শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকে, তবে পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু যদি এআই-সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ বিশ্বকে পথ দেখাতে পারবে। সরকারের উচিত প্রশিক্ষণের সাফল্যকে কতজন দক্ষ হলো তা দিয়ে নয়, বরং কতজন সফলভাবে আয় বা কর্মসংস্থানে যুক্ত হলো, সেই সূচক দিয়ে মূল্যায়ন করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাহিতুল ইসলাম। চাকরির আরও তথ্য: অনেক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলছে, এআই ও অটোমেশন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিপুলসংখ্যক চাকরি কমিয়ে দিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশরাফ খান: আশঙ্কাটি একেবারে অমূলক নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই আসল প্রশ্ন এআই আসবে কি না, সেটি নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘এআই-সক্ষম জনশক্তি’ বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশরাফ খান: একসময় কম্পিউটার জানা আলাদা দক্ষতা ছিল।

শেয়ার করুন