ঔপনিবেশিক শাসন ও সমাজ কাঠামোর গণতান্ত্রিক বিবর্তন: একটি বিশ্লেষণ

প্রকাশ:

ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ও সামাজিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস, ভাষা এবং শিক্ষার রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের গবেষক সুপ্রকাশ রায়ের মতে, নীল চাষ করতে অস্বীকার করলে চাষিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। তাদের নীলকরের কারাগারে বন্দী রেখে শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়া হতো, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো এবং পরিবারকে নিঃস্ব করে দেওয়া হতো। নীল বপনে স্বীকৃত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে নীলকরের কারাগারে আবদ্ধ হইয়া অশেষ শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইতো, তাহার গৃহ ভস্মীভূত হইতো, তাহার স্ত্রী-পুত্র পথের ভিখারী হইতো।”১০০।

ইংরেজ নীলকররা মুনাফার লোভে বাংলার কৃষকদের ধানের জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য করতো। এতে চালের উৎপাদন কমে গিয়ে কৃষকদের জীবনে চরম সংকট নেমে আসে। সেই সময় রাজা রামমোহন রায়ের মালিকানাধীন সাপ্তাহিক ‘সংবাদ-কৌমুদী’তে প্রকাশিত নিবন্ধেও নীল চাষের কারণে ধান উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টি উঠে এসেছিল। তবে বিস্ময়করভাবে, প্রভাবশালী অনেক বাঙালি এবং রাজা রামমোহনের বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কৃষকদের স্বার্থের বদলে নীলকরদের পক্ষে অবস্থান নেন। ১৮২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সভায় দ্বারকানাথ ঠাকুর ও রামমোহন রায় দাবি করেছিলেন যে, নীল চাষের ফলে কৃষকরা বরং উপকৃতই হচ্ছে। ফলে, বাংলায় চালের উৎপাদন কমতে থাকে, যার পরিণাম হলো কৃষকের আহারে ঘাটতি বেড়ে যাওয়া। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এই সমস্যাটির পরিচয় মেলে। হিন্দু ধর্ম-সংস্কার আন্দোলনের খ্যাতিমান নেতা রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩) মালিকানাধীন সাপ্তাহিক ‘সংবাদ-কৌমুদী’তে ১৮২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয় যে, “ইতিমধ্যে নীলকররা ধানের জমি দখল করে সেখানে নীল চাষ করছে এবং তার ফলে দেশের চালের উৎপাদন। 1772, 1833, 1828, 101. কিন্তু সেদিন ইংরেজি-শিক্ষিত ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা বা চাকরিসূত্রে জড়িত প্রভাবশালী বাঙালির অনেকেই কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে নীলকরদের ঔপনিবেশিক স্বার্থের তরফে দাঁড়িয়েছিলেন। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে রাজা রামমোহনের বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও (১৭৯৪-১৮৪৬) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সংবাদ-কৌমুদীর উপরোল্লিখিত নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায়, একই মাসে, একই পত্রিকায়, নীলকরদের সমর্থনে এক চিঠিতে লেখেন, “পূর্বে যেখানে চাষীদের জমিদারের জন্য বেগার খাটতে হ’তো, সেখানে নীলকরদের কাছ থেকে ভালো টাকা পাওয়া যাচ্ছে। মাসে ৪ টাকা করে, যার ফলে তারা স্বাধীনভাবে আছে, সুখে দিন কাটাচ্ছে। [।

বাস্তবচিত্র ছিল এর ঠিক বিপরীত। ১৮৬০-এর দশকের ইংরেজ কর্মকর্তা জর্জ গ্রাহাম তার ‘লাইফ ইন দ্য মোফস্বিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ইউরোপীয় পুঁজিপতিরা সরাসরি নীল চাষ না করে রায়তদের দাদনের জালে আবদ্ধ করতো। নীলকরদের দেওয়া নীলের দাম এতোই কম ছিল যে কৃষকদের পক্ষে লাভ করা অসম্ভব ছিল। গ্রাহাম নিজেই স্বীকার করেছেন, বিজয়ী জাতির জন্য বিজিতের প্রতি কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। এক পর্যায়ে এই শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকরা রুখে দাঁড়ালে নীলকর ও তাদের সহায়তাকারী ব্রিটিশ পুলিশ নির্মমভাবে তা দমন করে, যদিও ১৮৫৯-১৮৬০ সালের দিকে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে জবরদস্তিমূলক নীল চাষ বন্ধ করতে হয়।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা এশিয়া ও আফ্রিকার সমাজকে নিজেদের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেছেন। যেমন, আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে ‘জাতি’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে কেবল ‘ট্রাইব’ বা গোত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। একইভাবে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মিলের মতো ব্যক্তিরা ভারত সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও ভারতীয় ইতিহাসের বিকৃত বা খণ্ডিত ইতিহাস লিখে গেছেন। মিল প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করলেও ব্রিটিশ শাসনামলকে কেবল ‘ব্রিটিশ যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গবেষণার তথসূত্রসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো

  1. সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ৮৮
  2. সংবাদ-কৌমুদীর উদ্ধৃতির জন্য দেখুন, অমিতাভ চক্রবর্তী, আব্দুস সাত্তার খান: জীবন ও সংগ্রাম, প্রকাশকের (রবীন দাস) কথা, পৃষ্ঠা: ১৪
  3. প্রাগুক্ত
  4. G. Graham, Life in the Mofussil: Or, The Civilion in Lower Bengal, Vol-II, p. 4-5
  5. প্রাগুক্ত, pp. 6-7
  6. Ngugi Wa Thiong’o, “Macarere Dreams”, Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas, p. 68 ও James Mill, History of British India, London, 1817, Vol.-1, Preface, p. xii
  7. রোমিলা থাপার, “ভারতবিদ্যায় ডি ডি কোসাম্বির অবদান”, (অনু.) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ, ‘নতুন দিগন্ত’, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫, পৃষ্ঠা: ৮৪-১১০ এবং উপনিবেশবাদ ও বাঙালির সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা: ৭৯
  8. আমজাদ হোসেন, বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা: ১৫
শেয়ার করুন