গভীর সংকটে সিটি গ্রুপ: ঋণের পাহাড় ও বিনিয়োগ বিপর্যয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে শিল্পগোষ্ঠীটি

প্রকাশ:

১৯৭২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় একটি ছোট সরিষার তেলের মিল দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সিটি গ্রুপ। সময়ের পরিক্রমায় ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গ্রুপটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ফজলুর রহমানের ছেলে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান গ্রুপটির হাল ধরেছেন, কিন্তু ঋণের ভারে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবকে পুঁজি করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ হাতিয়ে নেয় সিটি গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে এবং প্রশাসনিক সুবিধা ধরে রাখতে তারা গণমাধ্যমকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রুপটি এখন চরম তারল্য সংকটে ভুগছে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর খেলাপি ঋণের বোঝা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস পর্যন্ত সিটি গ্রুপের কাছে দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এইচএসবিসি’র পাওনা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক পিএলসি’র ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, ইউসিবি’র ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ৯৮৬ কোটি টাকা।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ১০৮.৫৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি শিল্প প্রকল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। তবে অপরিকল্পিত এই বিনিয়োগের ফলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে, যার বিপরীতে নিয়মিত সুদ গুনতে হচ্ছে। সিটি গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে তাদের। এর পাশাপাশি ২০২২ সালে বিনিময় হারের বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণেও প্রতিষ্ঠানটি বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে গ্রুপটি এখন তাদের সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা করছে। হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটি এবং মালিকানাধীন ১৮ হাজার ৮৭৫ একর আয়তনের আটটি চা বাগানের আংশিক বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী খেলাপি হওয়া সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সম্ভব হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করবে। তবে ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, অতীতে একাধিক ব্যাংক মিলে কোনো শিল্প গ্রুপকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। এছাড়া প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভঙ্গুর ঋণ কাঠামোর মধ্যে নতুন করে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তথ্য বলছে, গত দেড় দশকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে গভীর সখ্য গড়ে তোলেন সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকেরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে চাটুকারিতার সেই সাম্রাজ্যে এখন ধস নেমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে আগের নেয়া খেলাপি ঋণ ও সুদের পাহাড় সিটি গ্রুপকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: এর ফলে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে, অথচ এর বিপরীতে অর্থায়নের খরচ বা সুদ ক্রমাগত জমা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যখন কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তার পরিণতি এমনই হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলো কতোটুকু ঋণ আদায় করতে পারবে তা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা চার-পাঁচটি ব্যাংক মিলে কাউকে উদ্ধার (সালভেজ) করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভোজ্য তেল, আটা-ময়দা, চিনি, ডাল, চাল, ফিডসহ অন্যান্য ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের ব্যবসা রয়েছে।

শেয়ার করুন