ঝিনাইদহের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম আনারের নিখোঁজ মামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নেই চূড়ান্ত আইনি

প্রকাশ:

ঝিনাইদহের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম আনারের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি দুই বছর পার হলেও এখনো তা হত্যা মামলা হিসেবে রূপান্তর করা হয়নি। ২০২৪ সালের ১৩ মে ভারতের কলকাতায় প্রভাবশালী এই সংসদ সদস্যের নিখোঁজ হওয়ার পর নির্মম পরিণতির শিকার হওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় এই অপহরণ মামলাটি দায়ের করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর ছয়জন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও অদৃশ্য কারণে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ পায়নি এবং ডিএনএ রিপোর্টও সংগ্রহ করা হয়নি।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা পুলিশ খুলনা অঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থি নেতা আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আকতারুজ্জামান শাহীনের বান্ধবী শিলাস্তি রহমানকে আটক করে। পরবর্তীতে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু ও ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ ওরফে গ্যাস বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া খাগড়াছড়ির পাহাড় থেকে ভাড়াটে খুনি ফয়সাল ও মুস্তাফিজকে এবং ভারত ও নেপাল থেকে জিহাদ ও সিয়ামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে ঝিনাইদহে মোবাইল উদ্ধারের নামে অভিযান চালানো হলেও তা নিষ্ফল হয়। এমপি আনারের নিখোঁজ হওয়ার আগে ২ মে তারা কলকাতায় যান এবং ১৯ মে ফিরে আসেন। সন্দেহভাজন মোস্তাফিজুর ও ফয়সালের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়, যেখানে শিমুল ভূঁইয়ারও বাড়ি। মামলার বিষয়ে জানতে থাইল্যান্ডে অবস্থানরত আনারের মেয়ে ডরিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

ঝিনাইদহ আদালতের পিপি মশিউর রহমান জানান, মামলা দায়েরের পর তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ ব্যর্থ হলে পিবিআইয়ের মতো সংস্থা রয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রতিবেদনের তারিখ পিছিয়ে গেলেও আদালতে তা জমা দিতেই হবে। ঝিনাইদহ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব বলেন, অপরাধের বিচার না হলে জনমনে ক্ষোভ বাড়ে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

২০১৪ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আনার ঝিনাইদহের স্বর্ণ চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন, যা নিয়ে খুলনার প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। ১২ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে বরাহনগর থানার মণ্ডলপাড়ায় গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে ওঠেন তিনি। ২২ মে নিউটাউনের সঞ্জীবা গার্ডেনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুম থেকে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। যদিও ফ্ল্যাটে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি, তবে কলকাতা পুলিশ সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রায় চার কেজি মাংস উদ্ধার করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত মাংসের ডিএনএ রিপোর্ট আনারের মেয়ের নমুনার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

আনারের বিরুদ্ধে অতীতে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালানসহ ২১টির বেশি মামলা ছিল। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো একে একে বাতিল হয়। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির আমলে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়া আনার ১৯৯১ সালে স্বর্ণ ব্যবসায়ী পরিতোষ ঠাকুরের সঙ্গে চোরাচালানে যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গার লোকনাথপুর এলাকায় ১২ কেজি ৯৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটকের ঘটনায় সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে আনারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিল পুলিশ। ২০০৯ সালে সাইফুল হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল এবং কালীগঞ্জের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই মামলাগুলোও ধামাচাপা পড়ে যায়।

আনারের পরিবারের সঙ্গে মিন্টুর দেখা করার ঘটনাকে ডরিন ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। স্থানীয়দের মতে, এক সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণকারী এবং অস্ত্র চোরাচালানের হোতা হিসেবে আনারের নাম পুলিশের খাতায় ছিল। ভারতের বাগদা সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান রুট নিয়ন্ত্রণে তিনি বাগদার মাদক সম্রাট জয়ন্ত কুমার, কার্তিক ও গৌতম সাহার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন।

মোবাইল উদ্ধারের নামে গ্যাস বাবুকে নিয়ে ওই বছরের ২৬ জুন হেলিকপ্টারে ঝিনাইদহে আসেন তৎকালীন ডিবিপ্রধান (বর্তমানে পলাতক) হারুন অর রশীদ।

এমপি আনার খুন হওয়ার আগে ২৪ সালের ২ মে তারা কলকাতায় যান, দেশে ফিরে আসেন ১৯ মে।

পুলিশ যদি তদন্তে ব্যর্থ হয়, তবে পিবিআই আছে।

দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় আনারের দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষ মাফিয়া ডন হয়ে ওঠার খবর প্রচার হতে থাকে।

ঝিনাইদহ শহরে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে দুটি পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে অভিযান চালানো হলেও সেটি নিষ্ফল হয়।

খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত শিমুল ভূঁইয়ার বাড়িও একই এলাকায়।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারের কোনো বিকল্প নেই।

এ নিয়ে যশোর ও খুলনার প্রভাবশালী কয়েকজন নাখোশ হন তার উপর।

অন্যথায় স্বর্ণের চালান আটকে দেওয়ার হুমকি দেন।

২৪ সালের ১২ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান এমপি আনার।

এরপর চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন তিনি।

তারপর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিলেন।

২২ মে হঠাৎ খবর পাওয়া যায়, কলকাতার পার্শ্ববর্তী নিউটাউন এলাকায় সঞ্জীবা গার্ডেন নামে আবাসিক ভবনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুমে আনার খুন হন।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি) ডিএনএর মিল পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল।

কালীগঞ্জ, মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানা পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তিতে মাদক ও ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান করতেন বলে স্থানীয়রা জানান।

স্বর্ণের বড় বড় চালান রাজধানী থেকে বাঘাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করতেন তারা।

চোরাকারবারিরা নিশ্চিত হয় যে, দর্শনার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সাইফুল ইসলাম স্বর্ণের চালান ধরিয়ে দিয়েছে।

ওই ঘটনার কদিন পর রমজান মাসে আসরের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যান।

সেখানে অজু করা অবস্থায় পেছন থেকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

ওই বছরের ২১ জানুয়ারি তাকে আটকের জন্য কালীগঞ্জ শহরের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ।

শেয়ার করুন