গত এক দশকের মধ্যে বৃটেন ও ইসরাইলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছে। দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বৃটিশ সরকারের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত বৃটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, গাজা উপত্যকায় ত্রাণ কার্যক্রম ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে গত বছর প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার’ থেকে বৃটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের অবনতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
বৃটেনের পাশাপাশি ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাসহ মোট ১২টি দেশ একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ায় ইসরাইলের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। লন্ডনের নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তনের বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন, তবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে আসা দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া তাদের কিছুটা বিস্মিত করেছে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সাথে একমত পোষণ করে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতিসহ পুরো দখলদারিত্বই অবৈধ। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই অবস্থানের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
নিষেধাজ্ঞার আওতা শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং বসতিগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, দখলদারিত্বে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে এমন অস্ত্র বিক্রির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নিজেকে ‘গর্বিত বৃটিশ ইহুদি’ এবং ‘ইসরাইল রাষ্ট্রের অবিচল সমর্থক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিলিব্যান্ড তার পূর্বসূরিদের তুলনায় ইসরাইল ইস্যুতে অনেক বেশি সরাসরি ও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসবাদ ও ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূলের’ মতো ঘটনা ঘটছে, যার দিকে ইসরাইল সরকার চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’আর এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই প্রতিক্রিয়া আরও জোরালো হয়েছে। যদিও অনেক ইসরাইলি নাগরিক বসতি স্থাপনকারীদের উগ্র মতাদর্শকে জাতীয়ভাবে বিব্রতকর বলে মনে করেন, তবুও আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তারা এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক মনোভাব দেখাচ্ছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট গত বছরই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে ফেলার অভিযোগ তুলেছিলেন। বর্তমানে ইউরোভিশন বা বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টে ইসরাইলবিরোধী প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং বসতি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনাগুলো ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা বসতিগুলো অবৈধ—এই আইনি অবস্থানের সঙ্গে ইসরাইলিদের বড় একটি অংশ এখনো একমত নন, তবুও আন্তর্জাতিক নিন্দার দেয়াল যে তাদের ঘিরে ফেলছে, তা এখন স্পষ্ট।
সূত্র: মানবজমিন








