সরকার পরিবর্তনের পরেও আমলাতন্ত্রের গভীরে প্রোথিত গাড়িবিলাসের সংস্কৃতি যেন কোনোভাবেই থামছে না। সরকারি প্রকল্পের নামে কেনা যানবাহন নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক স্বার্থে ব্যবহার করা যেন এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নাগরিকদের করের টাকায় কেনা এই গাড়িগুলোর অপব্যবহার শুধু অনৈতিকই নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্নীতি বিস্তারের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিপুল সংখ্যক গাড়ি কেনে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার বদলে ব্যক্তিগত ব্যবহারের বস্তুতে পরিণত হয়।
এক অনুসন্ধানে এলজিইডির অন্তত ২৬১টি গাড়ির এমন অপব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২১১টি গাড়ি সরাসরি এলজিইডির নিজস্ব কর্মকর্তাদের দখলে রয়েছে এবং বাকি ৫৯টি গাড়ি বণ্টন করা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো সংস্থাতেও এই প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের নজির রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথেই গাড়িগুলো পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, কর্মকর্তারা নিজেদের সুবিধামতো সেগুলো নিজেদের ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দপ্তরে সরিয়ে নিচ্ছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই গাড়িগুলো অন্য সংস্থাকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে কর্মকর্তারা নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো কৌশল অবলম্বন করছেন কি না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও নৈতিক স্খলনের চিত্র পাওয়া গেছে ৩৫ জন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে। এই কর্মকর্তারা একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে নিজস্ব গাড়ি কিনেছেন, অন্যদিকে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ভাতা নিচ্ছেন। একইসাথে তারা এলজিইডির প্রকল্পের গাড়িগুলোও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। এমন অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়সারা ও অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করছেন, যা তাদের জবাবদিহিতার অভাবকেই স্পষ্ট করে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মুখে এমন উক্তি যে, ‘এর চেয়ে বড় অকাম-কুকাম আছে, সেগুলো নিয়ে লিখুন’, তা প্রশাসনের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচায়ক।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মাথাভারী প্রশাসন পরিচালনায় বিশাল ব্যয় সরকারের উন্নয়ন বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও অপচয় কমানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি জোরালো হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও প্রকল্প পরিচালকের পদ ভাগাভাগি করার মাধ্যমে প্রশাসনকে রাজনীতিকরণের যে চর্চা চলছে, তা জনস্বার্থকে ব্যাহত করছে।
প্রকল্পের গাড়ি ফেরত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার তাগিদ ও চিঠি দেওয়া হলেও তারা তা তোয়াক্কা করছেন না। এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে কেবল চিঠি আদান-প্রদান যথেষ্ট নয়, বরং কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরকারকে অবিলম্বে প্রকল্পের গাড়ির এই অনিয়ম বন্ধ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে ২৬১টি গাড়ির একটি তালিকা পেয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এলজিইডির বিরুদ্ধে যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত ব্যাপক, সেখানে অন্য সংস্থার কর্মকর্তাদের গাড়ি দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কারভাবে স্বার্থের সংঘাত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকার যায় সরকার আসে, কিন্তু আমাদের আমলাতন্ত্রের গাড়িবিলাস বন্ধ হয় না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রশাসনযন্ত্রের শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাদের এই যোগসাজশমূলক গাড়িবিলাস শুধু অনৈতিক নয়, দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্রেও সহায়ক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশে সাধারণত প্রকল্পে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গাড়ি কেনা হয়।
সূত্র: প্রথম আলো








