প্রণোদনা ঋণে ধীরগতি: শর্ত শিথিলের দাবি ব্যবসায়ীদের

প্রকাশ:

দেশের বন্ধ কলকারখানা সচল করা এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে গত মে মাসে ৬২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদের এই ঋণের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। জ্বালানি সংকটসহ নানামুখী সমস্যায় ধুঁকতে থাকা শিল্পকারখানাগুলো এই তহবিলের সুফল সেভাবে পাচ্ছে না। পরিস্থিতির উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ১৮০ দিনের একটি নতুন পথনকশা তৈরির পরিকল্পনা করছে এবং এ বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে দফায় দফায় পরামর্শ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ঘোষিত ৬২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে গত মাস পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেছে এক হাজার কোটি টাকার কম অর্থ। বিশেষ করে, বন্ধ কারখানা চালুর উদ্দেশ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সিএমএসএমই, উত্তরবঙ্গের কৃষি হাব এবং কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল থেকে কোনো ঋণই এখনো বিতরণ করা হয়নি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, তহবিলের ঋণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং বিতরণের গতি বাড়াতে খাতসংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

তহবিলের গঠন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। নিজস্ব তহবিলের ৪১ হাজার কোটির মধ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের কৃষি হাব তৈরির জন্য রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২১ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের আওতায় প্রিশিপমেন্ট ফাইন্যান্স, পিকেএসএফ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি ব্যাংক, পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, স্টার্টআপ এবং হিমায়িত চিংড়ি ও চামড়া রপ্তানি খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রিশিপমেন্ট ফাইন্যান্স/প্যাকিং ক্রেডিট খাতের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র খাতের জন্য পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা। সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকা এবং স্টার্টআপদের অর্থায়নের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানিকারকদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা এবং চামড়া ও জুতা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ঋণ বিতরণে ধীরগতির কারণ ব্যাখ্যা করে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত। ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করছে। বন্ধ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব বন্ধ প্রতিষ্ঠান ঋণ চায় বা দেওয়ার আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোর পরিচালনা সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও ব্যাংকগুলোকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ঋণ বিতরণের নামে যেন ব্যাংক খাতে নতুন কোনো বিপদ ডেকে আনা না হয়। তিনি বলেন, সস্তায় ঋণ পেলেই হবে না, তা যোগ্য ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিতরণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিতরণের চাপের চেয়ে তদারকির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তহবিল বিতরণ সহজ করতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল কিছু শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন কারখানা তৈরির চেয়ে বন্ধ কারখানা চালু করা দ্রুত ও সহজ, তাই এই সুযোগটি কাজে লাগানো জরুরি। ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা যাচাই করা, খেলাপি হওয়ার শর্ত কিছুটা শিথিল করা, একই গ্রুপের এক প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ না করা, এবং মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদনের জন্য ব্যাংকগুলোকে কড়া নির্দেশনার প্রস্তাবও দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

শেয়ার করুন