ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় বড় বাধা: ওষুধের বিরুদ্ধে জিন বদলে টিকে থাকছে পরজীবী

প্রকাশ:

অণুজীবের টিকে থাকার লড়াইয়ে বিবর্তন এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যখনই কোনো নতুন প্রতিষেধক উদ্ভাবিত হয়, অণুজীবগুলো দ্রুত নিজেদের জিনগত কাঠামো বদলে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে ঢাল তৈরি করে নেয়। মানবদেহে ম্যালেরিয়া সৃষ্টিকারী সবচেয়ে বিপজ্জনক পরজীবী ‘প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম’-এর ক্ষেত্রে এই ওষুধ প্রতিরোধের ক্ষমতা এখন চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিখ্যাত সাময়িকী ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’-তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরজীবী কেবল নতুন ওষুধের বিরুদ্ধেই নয়, বরং বহু বছর আগে পরিত্যক্ত ওষুধের বিরুদ্ধেও নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রেখেছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইথিওপিয়ার আরমাওয়ার হ্যানসেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অলেমায়হু লেটেবো, যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের লিন এন ভ্যানহির এবং তাঁদের সহকর্মীরা। গবেষকদের তথ্যমতে, গত ৭০ বছরে উদ্ভাবিত ম্যালেরিয়ার প্রায় সব ওষুধের বিরুদ্ধেই প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এমনকি ১৯৭০-এর দশকে আবিষ্কৃত অত্যন্ত কার্যকর ওষুধ আর্টেমিসিনিনের কার্যকারিতাও এখন আংশিক হুমকির মুখে। ১৫ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধী পরজীবীর সন্ধান পাওয়া গেলেও, এখন আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে।

ইথিওপিয়ার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গবেষকেরা ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির ১৫টি জেলা থেকে ৬০৫টি প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের নমুনা সংগ্রহ করেন। জিন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্লোরোকুইন অনেক আগে চিকিৎসায় নিষিদ্ধ হলেও ৬১ দশমিক ২ শতাংশ নমুনায় এর প্রতিরোধী জিন এখনো সক্রিয় রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় থাকা ‘প্লাজমোডিয়াম ভিভাক্স’ নামক অন্য পরজীবীর চিকিৎসায় ক্লোরোকুইন ব্যবহৃত হওয়ায় ফ্যালসিপেরাম পরজীবীর জিনগত কাঠামোতে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা টিকে গেছে। একইভাবে, ২০০৫ সাল থেকে নিষিদ্ধ ‘সালফাডক্সিন-পিরিমেথামিন’ ওষুধের প্রতিরোধী জিন ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে।

বর্তমান চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের ক্ষেত্রেও পরজীবীর এই বিবর্তন স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ শতাংশ নমুনায় আর্টেমিসিনিনের বিরুদ্ধে আংশিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জিন বিদ্যমান। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এই হার ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যে পরজীবীগুলোর মধ্যে ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী মার্কার রয়েছে, সেগুলোর আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনা সাধারণের চেয়ে অন্তত তিন গুণ বেশি। এছাড়া বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত লুমেফ্যান্ট্রিন ওষুধের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার লক্ষণ ৯৩ শতাংশ নমুনায় শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, ম্যালেরিয়া নির্মূলে এখন আর সব জায়গায় একই কৌশল কার্যকর নয়। একেক এলাকার পরজীবী একেক ধরনের মিউটেশনের মাধ্যমে বিবর্তিত হচ্ছে। তাই ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোতে ফ্যালসিপেরাম ও ভিভাক্স—উভয় পরজীবীর ওপর নজর রেখে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। জিনগত বিন্যাসের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাপদ্ধতির ক্রমাগত মূল্যায়নই পারে এই বিবর্তন মোকাবিলায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে। ম্যালেরিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে এখনো লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, যার বড় শিকার আফ্রিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। তাই এই নতুন জিনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, একই অঞ্চলে দুই ভিন্ন পরজীবীর ওপর আলাদা ওষুধের চাপ ফ্যালসিপেরামের বিবর্তনে কেমন প্রভাব ফেলছে।

ক্লোরোকুইন প্রতিরোধী মার্কার থাকা পরজীবীদের মধ্যে আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনা অন্তত ৩ গুণ বেশি দেখা গেছে।

অণুজীবের দ্রুত রূপ বদলানোর ক্ষমতা তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বেশ এগিয়ে রাখে।

প্রকৃতিতে টিকে থাকার এই বিবর্তনীয় লড়াই বেশ পুরোনো।

প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হন।

মারা যায় লাখ লাখ মানুষ, যাদের বেশির ভাগই আফ্রিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

এর সঙ্গে বহু জিনগত পরিবর্তন জড়িয়ে থাকে।

এখন প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে আর্টেমেথার ও লুমেফ্যান্ট্রিন নামের দুটি উপাদানের মিশ্রণ ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে ম্যালেরিয়া কেবল একধরনের পরজীবীর কারণে হয় না।

প্লাজমোডিয়াম ভিভাক্স নামের আরেকটি পরজীবীও ম্যালেরিয়া ছড়ায়।

এটি অপেক্ষাকৃত কম প্রাণঘাতী এবং ক্লোরোকুইন দিয়েই এর নিরাময় সম্ভব।

এর অর্থ হলো, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ইথিওপিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট সমস্যায় ভুগছে না।

গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ইথিওপিয়ায় ফ্যালসিপেরামের আঞ্চলিক রূপান্তর ও ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল নেওয়া জরুরি।

শেয়ার করুন