যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের ‘অসম যুদ্ধকৌশল’ ও সাম্প্রতিক বিতর্ক

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে না জড়িয়ে কম খরচে চাপ প্রয়োগ করাই ইরানের দীর্ঘদিনের ‘অসম যুদ্ধকৌশল’-এর মূল ভিত্তি। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ড্রোন হামলা, ছোট নৌযানের মহড়া, মাইন স্থাপন, জাহাজে আঘাত এবং প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যবহারকে তেহরান নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য কেবল সামরিক ক্ষতি করা নয়, বরং ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে বিভেদ ও অস্বস্তি তৈরি করা।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে মার্কিন ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি গ্রেপ্তার এবং ইসরাইলগামী একটি ‘ফ্লাইদুবাই’ উড়োজাহাজের ককপিটে হামলার ঘটনার পর এই কৌশল আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকরা এসব ঘটনায় ইরানের ভূমিকার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে শুক্রবার পর্যন্ত কোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই তেহরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিমানঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরানের যোগসূত্রের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করেনি। চলমান যুদ্ধেও সেই কৌশল আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ফ্লাইদুবাই উড়োজাহাজের ককপিটে হামলার ঘটনার ক্ষেত্রেও ইরানি যোগসূত্রের কোনো প্রমাণ নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে যদি তদন্তে ইরানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে তা তেহরানের অসম যুদ্ধের নতুন ও বিপজ্জনক একটি মাত্রার উদাহরণ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সামরিক সক্ষমতার বড় পরিবর্তন আসায় তেহরান প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে পরোক্ষ উপায়ে প্রভাব বিস্তারে বেশি ঝুঁকেছে। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই ড্রোনসহ নানা অপ্রচলিত মাধ্যমের ব্যবহার দেশটি শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ আগের মিত্রদের সামরিক সহায়তা হারানোর পর তেহরান এই কৌশলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। তেহরানের এই কৌশলের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। এসব হামলার অনেকগুলো ইহুদি সম্প্রদায় ও ইরানের ইসলামি শাসনের বিরোধীদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেকারচি সম্প্রতি এই কৌশলের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, তার ভাষ্যমতে, শত্রুর ব্যয়বহুল ও ভারী অস্ত্রের মোকাবিলায় কম খরচের কিন্তু কার্যকর সরঞ্জাম ব্যবহার করাই এই যুদ্ধের সার্থকতা। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে ইরানের ড্রোন হামলা ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক ঝুঁকি ও ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। হরমুজ প্রণালিতে ছোট নৌযান ও মাইন ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরির বিষয়টিও এই রণকৌশলের অন্তর্ভুক্ত।

তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় দক্ষিণ লেবানন, ইয়েমেন, গাজা ও ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে সরাসরি দায় এড়িয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের চাপে রাখা সম্ভব হয়। ‘দ্য সুফান সেন্টার’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেহরান জানে প্রচলিত ও তীব্র যুদ্ধে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জেতা কঠিন। তাই তারা মূলত টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলাই আসল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হরমুজ প্রণালি।

বিদেশের মাটিতে পরোক্ষ তৎপরতা নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক ম্যাথিউ লেভিট গত বছর উল্লেখ করেছিলেন, প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি কমাতে ইরান প্রায়ই অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্যদের ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলেছিল, তাতেও এমন অর্থের বিনিময়ে ষড়যন্ত্রের তথ্য ছিল। যদিও ইরান সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করার চক্রান্ত বলে অভিহিত করেছে। এ কারণেই এসব অভিযোগ নিশ্চিত করা কঠিন এবং অস্বীকার করাও তুলনামূলক সহজ। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউরোপে বিভিন্ন অন্তর্ঘাতের ঘটনায় রাশিয়ার মদদের অভিযোগ উঠেছে।

ব্রিটেনেও ইরানের মদদপুষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও হামলার অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এমআই৫ প্রধান দাবি করেছিলেন, এক বছরে ২০টির বেশি প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের সন্ধান তারা পেয়েছেন। এছাড়া গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য ‘ইসলামিক মুভমেন্ট অব দ্য কম্প্যানিয়নস অব দ্য রাইট’ (আইএমসিআর) নামের একটি গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করে, যাদের বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের উপাসনালয়ে হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অর্থের বিনিময়ে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিজেদের কাজের প্রকৃত উৎস সম্পর্কেও সচেতন নয়। তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আন্তোনিও জিউস্তোজি সতর্ক করে বলেছেন, প্রমাণের ঘাটতি থাকলেও রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে সবকিছুর জন্য ইরানকে দায়ী করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সব অভিযোগ যে সত্য নয়, তা বুঝতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটি মিত্রদের ওপর চাপের বার্তা হিসেবে মিললেও, ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনায় ইরানকে জড়ানো কৌশলগতভাবে তেহরানের জন্য লাভজনক নয়। তদন্ত যত এগোবে, সাম্প্রতিক এসব অভিযোগের সত্যতা ততই স্পষ্ট হবে।

শেয়ার করুন