রোহিঙ্গাদের প্রাণের গানে মিশে আছে আরাকানের স্মৃতি ও ফেরার আকুতি

প্রকাশ:

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার তরুণ সংগীতশিল্পী শাহীন আবরার (২৮)। পেশাগত জীবনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের কর্মী হলেও, তাঁর সৃজনশীল সত্তা এখন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মানুষের হৃদয়ের ভাষা হয়ে উঠেছে। শাহীন রচিত ও সুরারোপিত ‘ও আরাকান, হান্দে যে দিলহান, হতদিন তোয়ার ন দেখি মুখহান’—অর্থাৎ ‘ও আরাকান কাঁদে যে হৃদয়, কত দিন তোমার মুখখানা দেখি না’—গানটি এখন উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার কাছে এক পরম আবেগের নাম।

২০২২ সালে কোস্ট ফাউন্ডেশনে যোগ দেওয়ার পর থেকেই শাহীন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবন, তাদের চোখের জল এবং জন্মভূমির প্রতি তীব্র টান খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। একজন সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে তিনি উপলব্ধি করেন, সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানবিক ট্র্যাজেডি ও সমসাময়িক সংকট তুলে ধরার শক্তিশালী হাতিয়ার। এই উপলব্ধি থেকেই ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি রোহিঙ্গা শিল্পী রোহেল খানের সহায়তায় গানটি তৈরি করেন। রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি এই গানটি রোহিঙ্গাদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।

গানটির জনপ্রিয়তা কতটা, তা স্পষ্ট হয় গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের আয়োজনে। মিয়ানমারে চালানো নির্মম গণহত্যার ৯ বছর পূর্তির সেই বিশেষ দিনে আশ্রয়শিবিরগুলোতে শাহীনের এই গানটি গাওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, গত এক বছরে এই গানটি রোহিঙ্গাদের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছে। আশ্রয়শিবিরে শাহীনকে দেখলেই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করা তাকে ঘিরে ধরেন এবং গানটি গাওয়ার অনুরোধ জানান।

গত ২৪ আগস্ট উখিয়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় শাহীন আবরার গানটি গেয়ে শোনান। সেই পাহাড়ের ওপাশেই দেখা যায় রাখাইন রাজ্য, যা টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিপরীতে ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত। ওই সময় শাহীনের সঙ্গে সুর মেলান তোফায়েল, আরাফাত বিন চৌধুরী, মো. জমিল ও সাইফুল নামের চার রোহিঙ্গা তরুণ। তোফায়েল ও জমিল জানান, এই গানটি লাখো রোহিঙ্গার জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতির প্রতিচ্ছবি। এটি তাদের শিকড়ের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী সব্বির আহমদ গানটি শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ফেসবুক বা ইউটিউবে যখন গানটি বাজে, তখন চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ত্রিপলের ছাউনির নিচে থাকলেও মন পড়ে থাকে আরাকানের সবুজ পাহাড় আর ধানের খেতে। গণহত্যা দিবস বা বিশেষ কোনো মুহূর্তে এই গান রোহিঙ্গাদের বুকের ভেতর এক নতুন আগুনের সঞ্চার করে।

শাহীন আবরার কেবল একটি গান নয়, বরং রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আশাকে উজ্জীবিত করতে আরও দুটি গান তৈরি করেছেন—‘একদিন আরাকান শহরত ফিরে যাইয়্যুম’ এবং ‘মুম-মিখ্যা চল’। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ‘ও আরাকান’ গানটিই রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে পঞ্চম শাহীন বিশ্বাস করেন, শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। তাঁর এই আন্তরিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি কেবল গান নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট ও ফেরার স্বপ্নকে সুরের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশ্রয়শিবিরের গলির চা–দোকানে টেবিল চাপড়ে গান গাইছেন কয়েকজন তরুণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছেড়ে আসা স্বদেশের জন্য এমন আবেগ জড়ানো গান খুব বেশি শোনা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরে গেলেই গানটি শোনার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই গানের গীতিকার ও সুরকার কক্সবাজারের উপজেলা কুতুবদিয়ার এক তরুণ সংগীতশিল্পী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই গান রোহিঙ্গাদের কাছে কতটা জনপ্রিয়, সেটা বোঝা যায় ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের দিনের অনুষ্ঠান সূচির দিকে তাকালে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কীভাবে রচিত হলো এই গান, সে কথা শাহীন নিজের মুখেই বললেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কুতুবদিয়ার আজম কলোনি গ্রামের সন্তান শাহীন আবরার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছোটবেলায় গানের তালিম নেন স্থানীয় দুই সংগীতশিক্ষক সমীর পাল ও সিরাজুল ইসলামের কাছে।

শেয়ার করুন