কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে দীর্ঘ এক দশক পর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে ডিএনএ রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে নতুন সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ বিশ্লেষণে পাঁচজনের শুক্রাণু এবং একজনের রক্তের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জনের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন তদন্তকারীরা।
আদালতের নির্দেশে এ পর্যন্ত চারজন সাবেক সেনাসদস্য এবং একজন বেসামরিক ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পাওয়া গেছে। গত ১৭ জুলাই আদালত নতুন করে আরও দুজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এদের মধ্যে রয়েছেন তনুর বন্ধু কুমিল্লার রাজাপাড়ার ফয়সাল আহমেদ রাব্বি এবং সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুল ইসলাম। তদন্তকারীরা ষষ্ঠ সন্দেহভাজনের পরিচয় এখনো প্রকাশ করেননি।
ডিএনএ রিপোর্টের সূত্র ধরে গত এপ্রিলে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তদন্তে উঠে এসেছে, মামলার অপর দুই সন্দেহভাজন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান জাহিদ এবং সাবেক সেনাসদস্য শাহীন আলম দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। জাহিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তদন্তকারীদের দাবি, শাহীন আলম গত এপ্রিলে গোপনে কুয়েতে পালিয়ে গেছেন। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে এবং সর্বশেষ লোকেশন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে।
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অভিযোগ করেছেন, ঘটনার শুরু থেকেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া চিকিৎসক ডা. কামদা প্রসাদ সাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন তনু সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফেরার পথেই তাকে হারিয়ে ফেলা হয়। তনুর মা আনোয়ারা বেগম জানান, তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে মৃত্যুর আগে মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চান।
বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরদিন সেনানিবাসের পাওয়ারহাউস এলাকার ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরদিন তনুর বাবা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর আগে ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাকের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।
তনুর মা আনোয়ারা বেগম আমার দেশকে বলেন, ‘আমি জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি, প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকি।
পরে সেনানিবাসের পাওয়ারহাউস এলাকার ঝোঁপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
তার প্রশ্ন, ভুয়া ফরেনসিক রিপোর্ট দেওয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কেন এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
কামদা প্রসাদ সাহা বর্তমানে খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
এরই মধ্যে কয়েকবার হাসপাতালেও গেছি।
প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এই বুঝি মরে গেলাম।
মরার আগে আমার মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে চাই।’
সূত্র: Daily Amar Desh








