সমুদ্র সাঁতরে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় প্রবেশ করা কয়েক হাজার অবৈধ অভিবাসী বর্তমানে চরম দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছেন। এল ত্রামপোলিন সৈকত বা শহরের উপকণ্ঠে মানবেতর জীবনযাপন করা এসব মানুষ মূল ভূখণ্ড ইউরোপে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তাদের একজন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসাইন (৩৪)। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছরেরও বেশি আগে তিনি বাংলাদেশ ছাড়েন। এরপর ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া ও আলজেরিয়া হয়ে ইউরোপের দিকে এগিয়ে যান। দীর্ঘ এই যাত্রাপথের বেশির ভাগ অংশ তিনি পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। তার সঙ্গে থাকা অনেক সহযাত্রী মরুভূমিতে তৃষ্ণায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি সেউতায় প্রবেশ করা শত শত অভিবাসী রোববার এল ত্রামপোলিন সৈকতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে স্পেনের কর্তৃপক্ষ যেন তাদের আশ্রয়ে সুযোগ দেয়। দুই সপ্তাহ আগে সেউতার সীমান্তে ব্যাপক অভিবাসী ঢলের পর সেখানে আটকে পড়া ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার মানুষের মধ্যে এই বিক্ষোভকারীরা রয়েছেন। ওই সময় প্রায় ৭২ হাজার মানুষ মাত্র ৮০ হাজার জনসংখ্যার ছোট ওই ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করেন। পরবর্তী কয়েক দিনে তাদের বিপুল অংশ স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেলেও যারা রয়ে গেছেন, তারা ইউরোপে প্রবেশের অধিকারের দাবিতে মরিয়া। মরক্কোর তেতোয়ান শহরের বাসিন্দা আয়ুব এলারুদ জানান, তারা সমুদ্রের পাশে ঠান্ডা ও দুর্গন্ধের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তার অভিযোগ, পুলিশ অভিবাসীদের শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে বাধা দিচ্ছে। রোববার বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল স্পেনের পতাকা এবং বিভিন্ন ব্যানার, যেখানে লেখা ছিল ‘আমরা মরক্কোয় ফিরে যেতে চাই না’ ও ‘আমরাও মানুষ’।
এর আগে চলতি সপ্তাহে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানান, অনিয়মিতভাবে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের সেখানে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। তাদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সুযোগ বা বৈধ মর্যাদাও দেয়া হবে না, তবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষভাবে অসহায় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। এমন অবস্থায় শহরের সীমিত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী প্রচণ্ড চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ধীর বলে সমালোচনা করেন সেউতার মেডিকেল বোর্ডের প্রধান এনরিকে রোভিরাল্তা। তার দাবি, সেখানে সংক্রামক ডায়রিয়া ও খোসপাঁচড়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মারামারি ও সহিংসতায় নাক ভেঙে যাওয়া কিংবা ছুরিকাঘাতের মতো আঘাতের ঘটনাও বেড়েছে।
মরক্কোর অধিকাংশ অভিবাসী জানিয়েছেন, নিজ দেশে খারাপ কর্মপরিবেশ ও কম আয়ের কারণে তারা ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সেউতায় থাকা সবাই কেবল অর্থনৈতিক কারণে আসেননি; অনেকেই যুদ্ধ, অপহরণের ভয় ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে এসেছেন। উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া ৩০ বছর বয়সী ইলেকট্রিশিয়ান ইমানুয়েল জানান, সন্তানদের অপহরণের আশঙ্কায় তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই তিনি নাইজার, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে চার মাসের বিপজ্জনক যাত্রা শুরু করেন। দক্ষিণ সেনেগালের ওসমান জানান, যৌন পরিচয়ের কারণে নিপীড়নের শিকার হওয়ায় তিনি আশ্রয় চাইছেন। তবে স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি এখনো কোনো উত্তর পাননি। সেউতায় অভিবাসীদের এই পরিস্থিতি এখন স্পেনের জন্য মানবিক, রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: মানবজমিন








