ভারতের নির্বাচন কমিশন পরিচালনার ধরন নিয়ে বিরোধী মহলে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘কর্তৃত্ববাদী চরিত্র’ ও অগণতান্ত্রিক আচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীরা। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সাম্প্রতিক বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারকে বিজেপির হাতের পুতুল হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁকে সরাতে দেশজুড়ে লাগাতার আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগছে, বিজেপির বিরোধিতায় সবাই একজোট কি না, তা নিয়ে।
এই ইস্যুতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরে ভোটচুরির অভিযোগ তুললেও তা একসময় সেভাবে আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। বিষয়টিকে সর্বজনীন রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়াকে। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১০ মাস ধরে অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে আজও তিনি কোনো কার্যকর ব্যাখ্যা দিতে পারেননি, বরং কমিশনের পরবর্তী কর্মকাণ্ড অভিযোগগুলোকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি যন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা যন্ত্র। রীতিমতো তথ্য দাখিলের মধ্য দিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের যে ছবি তিনি তুলে ধরেছেন, যেভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ১০ মাস ধরে দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির আপত্তি অগ্রাহ্য করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন—জ্ঞানেশ কুমার আজ পর্যন্ত তা খণ্ডন করতে পারেননি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ওই প্রতিবেদনই বিজেপি বিরোধীদের নতুন করে জমাট হতে সাহায্য করেছে। আপাতদৃষ্টিতে সবাইকে জোটবদ্ধ মনে হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনের পরই খণ্ড খণ্ডভাবে প্রতিবাদ জানানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্ধব ঠাকরে ও তেজস্বী যাদবদের মতো নেতারা এবার সমস্বরে সরব হয়েছেন। বুধবারের ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে ২০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও, জোটের অন্দরের এই ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিএমকে-র অনুপস্থিতি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তামিলনাড়ুর রাজনীতির সমীকরণ বদলানোয় ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন এখন কংগ্রেসের প্রতি কিছুটা শীতল। এমনকি বিজেপিবিরোধী অবস্থান সত্ত্বেও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে বৈঠকে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। কংগ্রেসের মধ্যে যে তাগিদ অনুভূত, অন্য অনেকের মধ্যে তা কতটা সঞ্চারিত, সেই সংশয় এখনো কাটানো যায়নি। একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে।
আপ, সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলের ক্ষেত্রেও দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল সিইসি-র কঠোর সমালোচনা করলেও আন্দোলনের ময়দানে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে নারাজ, কারণ পাঞ্জাবে তাদের মূল লড়াই কংগ্রেসের সঙ্গেই। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সমাজবাদী নেতা অখিলেশ যাদবের ক্ষেত্রেও; তিনিও রাজ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কংগ্রেসকে সতর্ক করে রাখছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অধিকাংশ আঞ্চলিক দল নিজেদের খাসতালুক রক্ষা করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিজেপির আগ্রাসী রাজনীতিতে শিবসেনা বা এনসিপি-র মতো দলগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, বিআরএস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস বা বিজু জনতা দলের মতো শক্তিগুলো ইন্ডিয়া জোটে নাম লেখাতে দ্বিধা করছে। এনডিএ শরিকদের মধ্যেও অনেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে এখনই জোট ভেঙে বেরিয়ে আসার মতো কোনো লক্ষণ তাদের মধ্যে নেই।
আগামী ২ অক্টোবর, শুক্রবার গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্ডিয়া জোট। একই দাবিতে মাঠে নামছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। অতীতে তেলাপোকাদের আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল, এবার সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণই তাদের প্রধান লক্ষ্য। সরকারকে দ্বিতীয়বার নতজানু করার দৌড়ে ইন্ডিয়া জোট নাকি সাধারণ তরুণ প্রজন্ম—কাকে শেষ পর্যন্ত সাফল্য ধরা দেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। এ কথা অনস্বীকার্য, অনেক দিন পর বিরোধীদের কাছে এমন এক বিষয় উপস্থিত, যা বিজেপিকে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে রেখেছে।
সূত্র: প্রথম আলো








