ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব এক কঠিন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান এবং নাজরানের মতো এলাকায় ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা রিয়াদের জন্য নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। এসব হামলায় অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন, বিভিন্ন স্থানে আগুন লেগেছে এবং জ্বালানি স্থাপনায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে।
সৌদি আরব বর্তমানে দ্বিমুখী হুমকির মুখোমুখি। এক দিকে নিজের ভূখণ্ড রক্ষা এবং অন্য দিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব এলাকাটি ভারত মহাসাগর ও সুয়েজ খালের সংযোগস্থল হওয়ায় এখানে হুথিদের যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী হুমকি পণ্য পরিবহন ব্যয় ও বিমা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে, তবুও লোহিত সাগরের নিরাপত্তাঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে। তবে হুথিদের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড রিয়াদের এই কৌশলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ফিরে যাওয়া সৌদি আরবের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয়বহুল হতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা বা বারবার ভূখণ্ডে হামলা মেনে নেওয়াও দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সৌদি আরব গত এক দশকে বড় ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দেশটি তার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক আধুনিক করেছে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করেছে। তবে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি সফলভাবে হামলা ঠেকিয়ে দিলেও, আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।
এই সংকট মোকাবিলায় রিয়াদের জন্য প্রয়োজন কৌশলী প্রতিরোধ। সৌদি আরবকে এমন বার্তা দিতে হবে যে, তাদের ভূখণ্ডে হামলার পরিণতি হুথিদের রাজনৈতিক বা সামরিক লাভের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হবে। এ ক্ষেত্রে বড় কোনো সামরিক অভিযান চালানোর বদলে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করার মতো পদক্ষেপগুলো বেশি কার্যকর হতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য আরও বড় উদ্বেগ হলো ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রা। দেশটির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং তেলের বাইরের বিভিন্ন প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। হামলায় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সাময়িকভাবে তেলের দাম বাড়লে আয়ের কিছুটা সুবিধা হতে পারে, তবে যুদ্ধের কারণে এমন অস্থিরতা কাম্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদের সামনে এখন বড় ধরনের সামরিক অভিযান বা নীরবতার চেয়েও কার্যকর পথ হলো ‘হিসাবি চাপ’। এর মাধ্যমে সৌদি আরব হুথিদের বোঝাতে পারে যে, যেকোনো উসকানিমূলক হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে শক্তিশালী করে তাদের ওপর প্রধান দায়িত্ব ন্যস্ত করা প্রয়োজন। এর ফলে সংঘাতটি ‘ইয়েমেন বনাম সৌদি আরব’ হিসেবে না হয়ে ইয়েমেনিদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ লড়াই হিসেবেই বজায় থাকবে।
রিয়াদের বর্তমান নীতির মূল স্তম্ভ হওয়া উচিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ খোলা রাখা। তবে কূটনীতির সফলতার জন্য একটি শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। পরিশেষে, সৌদি আরব কোনো দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত চায় না, কারণ তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। তবে সেই শান্তি রক্ষার খাতিরে নিজের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক হুথি হামলাগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাবে জাহাজ চলাচল নিয়েও হুথিরা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গোষ্ঠীটির হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ক্রমেই উন্নত ড্রোন রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পূর্বে হরমুজ প্রণালি, পশ্চিমে বাব আল-মানদাব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হলে পরিবহন সময় ও খরচ আরো বাড়তে পারে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








