১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরেছিল আওয়ামী লীগ। তবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মেয়াদের শেষ দিকে সরকারের শাসনকাল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা সমালোচনা তৈরি হয়। সে সময় নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ফেনীতে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলার মতো ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে চারদলীয় জোট বড় জয় পায়। এই জোট ২১৬টি আসনে জয়ী হয়। এর মধ্যে বিএনপি ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে একাই ১৯৩টি আসন নিশ্চিত করে। জোটের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) ৪টি এবং ইসলামী ঐক্যজোট ২টি আসনে জয়লাভ করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের ২১৬টিতে জয় পায় চারদলীয় জোট। এর মধ্যে ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯৩ আসন পায় বিএনপি। অবশ্য শতাংশের হিসাবে দুই দলেরই ভোট বেড়েছিল। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ও আওয়ামী লীগ ৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
অন্যদিকে, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পেলেও আসন সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২টিতে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসন পায়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১৪৬টি আসন পাওয়া আওয়ামী লীগের জন্য ২০০১ সালের এই ফলাফল ছিল বড় ধরনের বিপর্যয়, যেখানে বিএনপির আসন সংখ্যা ১১৬ থেকে বেড়ে ৭৭টি বৃদ্ধি পায়। সে সময় বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ, বিএনপির সফল জোট গঠন এবং বিরোধী ভোটের বিভক্তি কমে যাওয়া এই ফলাফলের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তখনকার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের এই ‘নাটকীয় পরাজয়ের’ নেপথ্যে ছিল আইনশৃঙ্খলাজনিত দুর্বলতা ও বিএনপির অধিক সফল জোট গঠন।
নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ক্ষমতা হস্তান্তরের রাতে লতিফুর রহমান ২৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বদলি করেছিলেন, যা নিয়ে সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছিলেন যে, নির্বাচনের ফলাফল বদলে দিতে সূক্ষ্ম নয় বরং অত্যন্ত স্থূল কারচুপি করা হয়েছে। এর আগে নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশে। এর বাইরে ১৯৯১ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন পঞ্চম সংসদ নির্বাচন হয়।
নির্বাচনের পরদিন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই ফলাফলকে মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং সংসদ বর্জনের কথা বলেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ দাবি করে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ফলাফল মেনে সংসদে যোগদানের অনুরোধ জানালেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।
একপর্যায়ে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ পিছিয়ে ৯, ১০ ও ১১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। ৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াসহ ১৯৭ জন সংসদ সদস্য শপথ নেন। ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তার সঙ্গে শপথ নেয় ৬০ সদস্যের মন্ত্রিসভা। সেই দিন আওয়ামী লীগের অবরোধ কর্মসূচি থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় দলের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। তবে অভ্যন্তরীণ চাপে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এদিকে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার পর ২৪ অক্টোবর দলের সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন এবং শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২৮ অক্টোবর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলেও বিরোধী দল সেখানে উপস্থিত থাকেনি।
২০০১ সালের নির্বাচনের দুই দিন পর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দলের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ষড়যন্ত্র বা কারচুপির পাশাপাশি দলীয় কৌশলগত ত্রুটির দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়েছে, যা ২০০১ সালের পর দলের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








