লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দেখা মিলল বিরল ও ভেষজ গুণসম্পন্ন রামবাসক ফুল

প্রকাশ:

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। উদ্যানের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সোজা পথে হাঁটার সময় প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়ে। বনের ভেতরে কিছুটা এগিয়ে যেতেই নজরে আসে রেললাইন, যার পাশেই রয়েছে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র ‘আমার আছে জল’-এর দৃশ্য ধারণের স্মৃতিফলক। সেখান থেকে সামনে এগোলে দেখা মেলে বিরল বাঁশপাতাগাছের। এছাড়া উদ্যানের একটি মোড়ে ১৯৫৫ সালে হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’-এর শুটিংয়ের তথ্য সম্বলিত ফলকও রয়েছে।

বন কর্মকর্তার বাসভবনের কাছে স্থানীয় খাসিয়াপল্লির দিকে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথের পাশে হঠাৎ চোখে পড়ে লাল রঙের ফুলে ভরা এক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এটিই রামবাসক বা লাল বাসক। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Phlogacanthus thyrsiformis। এটি Acanthaceae পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী শাখা-প্রশাখাযুক্ত উদ্ভিদ। সাধারণত ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু এই গাছটি ঝোপালো প্রকৃতির হয়। তবে ভারতের গাড়োয়াল অঞ্চলের মতো কিছু এলাকায় এটি ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

রামবাসকের পাতাগুলো বেশ বড় ও উপবৃত্তাকার, যা দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর পত্রবিন্যাস বিপরীতমুখী এবং পাতার কিনারা অনেক সময় খাঁজকাটা থাকে। তবে এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর নলাকার ও লালচে রঙের ফুল, যা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। পাঁচটি পাপড়ি মিলে তৈরি এই ফুলের গড়ন হাঁ-করা সিংহমুখের মতো হওয়ায় একে ‘সিংহাস্য’ বলা হয়। আবার পুষ্পদণ্ডের গঠন সিংহের লেজের মতো হওয়ায় এর আরেক নাম সিংহপুচ্ছ। ইংরেজিতে একে ‘কার্ভড-ফ্লাওয়ার ফ্লেম-অ্যাকান্থাস’ নামে ডাকা হয়।

বাংলায় এই উদ্ভিদের নামের আগে ‘রাম’ শব্দটি এর রূপ ও গুণের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তিতা স্বাদের কারণে অনেকে একে ‘তিতাফুল’ বা ‘লাল বাসক’ বলেও চেনেন। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভুটান, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং উত্তর ভারতের পাহাড়ি ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে এটি প্রচুর জন্মে। মণিপুরি সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘নংমাংখা আসিনবা’ নামে পরিচিত।

ভেষজ চিকিৎসায় রামবাসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ বাসকগাছের মতোই এটি ঠান্ডা, কাশি, অ্যাজমা, হুপিং কাশি ও রক্তপিত্তের মতো রোগ উপশমে কার্যকর। মণিপুরে জ্বর ও কফ সারাতে এর পাতা সেদ্ধ করে চায়ের মতো পান করার ঐতিহ্য রয়েছে। তবে যেকোনো ভেষজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

প্রথাগত চিকিৎসার বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলে রামবাসক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মণিপুরে এর তাজা বা ভাজা ফুল স্বাস্থ্যকর টনিক হিসেবে খাওয়া হয়। আবার অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দারা এর ফুল পিষে মসলা হিসেবে রান্নায় ব্যবহার করেন। প্রকৃতির এই রূপসী ও ভেষজ উদ্ভিদটি বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং লোকায়ত চিকিৎসার এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মোড়ের এক পাশের ফলকে লেখা রয়েছে, এখানে ১৯৫৫ সালে বিখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ-এর শুটিং হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পথের দুই ধারে সারি সারি নানা প্রজাতির গাছপালা, যেন প্রকৃতির এক অপরূপ আয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নগ্নবীজি এই উদ্ভিদের পাতা দেখতে বাঁশের মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেরি না করে ঝটপট কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বনে-জঙ্গলে এই উদ্ভিদের দেখা মেলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে আমাদের দেশের সিলেটের বনাঞ্চল, যেমন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবুজ গভীরে হাঁটলে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে রক্তিম আভার এই মনোহর গুল্মটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঁচটি পাপড়ি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নলাকার গঠন তৈরি করে, যার নিচের ঠোঁটটি তিন খণ্ডে এবং ওপরের ঠোঁটটি দুই খণ্ডে বিভক্ত।

শেয়ার করুন