যৌথ নদী কমিশনের সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন বা আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৪টি। তবে এই সংখ্যাটি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বাস্তবে দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর সংখ্যা এই তালিকার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন নদী গবেষকরা। যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয় ১৯৭২ সালে, যেখানে বাংলাদেশের তালিকা অনুযায়ী মোট আন্তসীমান্ত নদী ৫৭টি, যার মধ্যে ৩টি মিয়ানমারের সাথে এবং বাকি ৫৪টি ভারতের সাথে অভিন্ন। মোট কতটি, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না। এখানে আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৬৮ উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরই এ কাজ করা প্রয়োজন ছিল। আন্তসীমান্ত নদীর তালিকা স্পষ্ট না হলে ভারতের দিক থেকে নদীর পানি ইচ্ছেমতো প্রত্যাহার করার সুযোগ থাকে।
পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত, যিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কমিশনের অনারারি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি জানান, ৫৪টি নদী নির্ধারণের সময় কোনো সঠিক সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়নি, অথবা যেটুকু হয়েছে তা যথাযথ ছিল না। এই হিসাবের গরমিল নিরসনে এবং সব অভিন্ন নদীকে যৌথ স্বীকৃতি আনার জন্য সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলা দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
রংপুর বিভাগে চালানো সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ১৮টি নদীর বাইরেও সেখানে আরও ৬৩টি আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকায় নেই এমন ১০টি নদীও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদীগুলো বাস্তবে সক্রিয় থাকলেও সরকারি নথিতে নেই। আবার দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর ক্ষেত্রে খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘা নদীর মিলিত প্রবাহ থাকলেও, এককভাবে খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘার নাম তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে রংপুর বিভাগেই স্বীকৃতির বাইরে রয়েছে ৪৬টি নদী।
অন্যান্য গবেষক ও সংগঠনের হিসাব আরও বিস্তৃত। ইতিহাস ও নদী-গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী সারা দেশে এখন পর্যন্ত ২২৩টি আন্তসীমান্ত নদীর সন্ধান পেয়েছেন। এছাড়া ২০১৭ সালে নদী-গবেষক ম ইনামুল হক তাঁর ‘বাংলাদেশের নদনদী’ বইয়ে ১৬৭টি নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন জানান, ২০১৬ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের কাছে আরও ১৬টি নদী অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দিলেও তা গৃহীত হয়নি। এতে সারা দেশে ১ হাজার ৮টি নদীর নাম উল্লেখ আছে।
প্রচলিত তালিকাটি মূলত ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা নদীগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, অথচ বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়ে ভারতে প্রবাহিত নদীর তথ্য সেখানে অনুপস্থিত। কুলিক নদ ছাড়া রংপুর বিভাগেই এমন আরও ১১টি নদী রয়েছে, যার মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের কাহালাই, জলই, টাঙন; দিনাজপুরের তেঁতুলিয়া, নোনা, ভেলামতী, ছোট যমুনা; পঞ্চগড়ের বেরং, ডাহুক এবং লালমনিরহাটের চেনাকাটা ও খর্প অন্যতম।
সরকারি নথিপত্রের অসংগতি প্রকট। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৩ সালের বইয়ে আন্তসীমান্ত নদী ৬৮টি উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের ৫৪টির সাথে সবগুলোর মিল নেই। অন্যদিকে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে ১২৬টি নদীকে আন্তসীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রচলিত ৫৪টির মধ্যে ৪৩টি সেখানে থাকলেও, মন্ত্রণালয় নিজেই অতিরিক্ত ৮৩টি নদীকে আন্তসীমান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। দুঃখজনকভাবে বইটি ভীষণ অবহেলায় প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এই হিসাব স্পষ্ট না হওয়া বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা। ভারত উজানের দেশ হওয়ায় কুড়িগ্রামের কালজানি, গদাধর ও গঙ্গাধরের মতো বড় নদীগুলো তালিকার বাইরে থাকলে ভারতের পানি প্রত্যাহারে আইনি বাধা সৃষ্টি করা কঠিন হয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদারের মতে, সীমান্তবর্তী প্রতিটি মৌজার সিএস, এসএ ও বিএস রেকর্ড যাচাই করে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে নির্ভুল তালিকা তৈরি করা এখন জরুরি। নদী নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদেরও এখন এই স্বীকৃতির দাবি জোরদার করতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো








