নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নতুন কৌশলে নাশকতার ছক কষছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তারা রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জড়ো হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আত্মগোপনে থাকলেও তাদের সাংগঠনিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানে পতনের পর থেকে তারা এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বার্তা ছড়িয়ে কর্মীদের সক্রিয় রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নাশকতায় উদ্বুদ্ধ করছে। এসব ঘটনায় দলটির অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, টেস্ট কেস হিসেবে তারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সর্বশেষ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে বাটা শোরুমের সামনে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে জড়ো হতে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের ব্যানারে তারা সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের ছবি নিয়ে মাত্র ১০ সেকেন্ড স্লোগান দেয়। এরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তারা অলিগলিতে গা ঢাকা দেয়। পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে বিদেশে থাকা টেলিগ্রাম গ্রুপে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য আগেই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া থাকে। এমন ঝটিকা মিছিল ও বিস্ফোরণের ঘটনা এখন তাদের নতুন গেরিলা কৌশলের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে আরেকজন। পরে ওই নেতাকর্মীরা ৩০ সেকেন্ডেই গলির ভেতর হাওয়া। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ করা হয়। প্রথম ১০ সেকেন্ডে একটি গলি বা মার্কেটের ভেতর কিছু যুবক ব্যানার নিয়ে বের হয়ে রাস্তায় জড়ো হয়। শেষ ১০ সেকেন্ডে তারা ব্যানার ফেলে তিনদিকে দৌড়ে অলি-গলিতে উধাও হয়ে যায়।
গত এক সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট ফটক, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর, মগবাজার, মৎস্য ভবন মোড়, রামপুরা বিটিভি ভবন, কাফরুল, মিরপুর-১১ ও বাড্ডাসহ অন্তত ১২টি স্থানে ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং ৯টি বাসে অগ্নিকাণ্ডের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও ৯ হাজার মুখোশ জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ দলটি তিন স্তরে তাদের গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রথম স্তরে মেস ও ছাত্রাবাসে অবস্থানরত কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বহনের কাজ করে। দ্বিতীয় স্তরে মাঝারি সারির নেতারা বাসা ভাড়া নিয়ে নাশকতার ছক তৈরি করে। তৃতীয় স্তরে হোটেল ও লাক্সারি ফ্ল্যাটে অবস্থান করে শীর্ষ সমন্বয়কারী এবং অর্থদাতারা। ভিডিও ফুটেজ বিদেশে পাঠানোর বিনিময়ে মাঠকর্মীদের বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রদান করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে অন্তত ৩০-৪০ জন ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও পরিবহন মালিকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যারা এই নাশকতায় অর্থায়ন করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপি’র প্রতিটি বিভাগকে নাশকতা ঠেকাতে ১০-১২ জন অর্থদাতার তালিকা সরবরাহ করা হয়েছে। ঢাকা ও এর বাইরে থেকে গত কয়েকদিনে কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ধৃত রায়হান উদ্দিন জানিয়েছে, তাকে ভারতীয় নম্বর থেকে নির্দেশনা দিতেন মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সম্পাদক সাব্বির হোসেন। মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাকিব ওরফে আসিফকেও বিদেশে পলাতক মিরাজ বিশ্বাস নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ মিলেছে। এদিকে নজরদারিতে থাকা আত্মগোপনকারী নেতা মাহফুজুর রহমান মিতাকে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করেছে।
পুলিশের ঘন ঘন বদলির কারণে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যে কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয়ায় এই গেরিলা তৎপরতা পুরোপুরি রুখতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাহিনীর অপারেশনাল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। গোয়েন্দারা এখন বিদেশে পলাতক অর্ধশত কেন্দ্রীয় নেতার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন। টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ রাখা এই চক্রটিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে নজরদারি ও অভিযানের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন








