তীব্র বন্যায় বিপর্যস্ত ব্যাংকক, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

প্রকাশ:

ভারী বৃষ্টিপাতে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নগরীর ৫০টি জেলাকেই বন্যাদুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও প্রধান সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মানুষ বাধ্য হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার পরিবার। অনেক এলাকায় পানির উচ্চতা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। ওই বছর থাইল্যান্ডজুড়ে বন্যায় ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপরও বাড়ির নিচতলা পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তাক খালি হয়ে যায়।

ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসনের (বিএমএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত নগরীর কিছু অংশে ৩৩০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার পর শনিবার রাজধানীজুড়ে দুর্যোগকবলিত অবস্থা ঘোষণা করা হয়। খালগুলো উপচে পানি লোকালয় ও প্রধান সড়কে প্রবেশ করায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।

রামখামহেংসহ বেশ কিছু এলাকার রাস্তায় কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, যেখানে যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দোকান ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভাসিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা কোসিন নিলসেট জানিয়েছেন, তার বাড়ি প্রায় ৩০ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। তার মতে, এবার পানির উচ্চতা ২০১১ সালের ভয়াবহ বন্যার চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে। অনেকে প্লাস্টিকের পাত্রে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভাসিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পানি খালের প্রতিরক্ষা দেয়াল অতিক্রম করার পর পরিবারটি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওপরের তলায় সরিয়ে নেয়।

আরেক বাসিন্দা থিদারাত সিলসুয়ান পানির কারণে দুই দিন ধরে টেবিলের ওপর রাত কাটিয়েছেন। ঘরের ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনের মতো বড় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো সরিয়ে নিতে না পারায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। এদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকক ও সংলগ্ন তিন প্রদেশের সরকারি কর্মীদের জন্য ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে মন্ত্রিসভা, যাতে সড়কে যানজট কমে এবং ত্রাণ কার্যক্রম সহজ হয়। আরেক বাসিন্দা থিদারাত সিলসুয়ান আংশিক পানিতে ডুবে থাকা নিজের বাড়িতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বন্যার প্রভাব পড়েছে শিক্ষাঙ্গনেও; সোমবার নগরীর শত শত স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সতর্ক করেছে যে, নিত্যপণ্যের সংকট সৃষ্টির সুযোগ নিয়ে কেউ যেন অতিরিক্ত দাম না রাখে। নাগরিকদের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগ জানিয়েছে, ব্যাংককসহ থাইল্যান্ডের মোট ২১টি প্রদেশে বন্যার খবর পাওয়া গেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৫ দিনে ব্যাংককে ৪৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যেখানে ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের একই সময়ের গড় ছিল প্রায় ২৬৯ মিলিমিটার। এবারের বৃষ্টিপাত বিগত বছরগুলোকে ছাড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাম্পিং স্টেশনগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পানি নিষ্কাশনে কাজ করছে এবং যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ১০ লাখ বালুর বস্তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

রোববার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও নগরীর খালগুলোতে পানির উচ্চতা এখনো বিপদজনক পর্যায়ে রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টি কমলে জমে থাকা পানি নামতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

২০১১ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেও এবারের দুর্যোগে এখনো সেই মাত্রায় প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে, যা ব্যাংককের মতো শহরের দীর্ঘমেয়াদী নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেয়ার করুন