রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভয়াবহ লুটপাট ও তাণ্ডবের ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। তবে ঘটনার তিন দিন পার হতে চললেও এর নেপথ্যে থাকা মূল ইন্ধনদাতা বা নির্দেশদাতাদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট এবং তাণ্ডবের ঘটনায় ৯ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া এমন পরিকল্পিত হামলা সম্ভব নয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার রাতে একটি এস্কাভেটর ও ট্রাক ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে লুটপাট চালানো হয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে মালামাল লুট করছিল। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। জমি দখলের উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও স্থানীয়রা বলছেন, এর আগে কখনোই এই জায়গাটি জোরপূর্বক দখল করার চেষ্টা করা হয়নি। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলো, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট, দায়ের করা মামলার এজাহার ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি জমি দখল সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই ঘটানো হয়েছে। মতলব নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, এই হাসপাতালের জায়গায় কেউ দখল করার অধিকার নেই। এই সমস্ত জায়গা সম্পত্তি সব শাহ-আলী পীরের নামের ছিল।
হামলার ঘটনায় স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে আসছে বিভিন্ন সূত্রে। যদিও ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপি নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া ক্লিনিকে লাগানো বিলবোর্ডে ‘সমমনা সমবায় সমিতি’র নামে দখলদারদের সাইনবোর্ড পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমপির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে অভিযুক্ত এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ঘটনাটি ঘটেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান থাকায় এখনই ঢালাওভাবে কারো নাম বলা যাচ্ছে না। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। অপরদিকে, রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার আক্ষেপ করে বলেছেন, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু ঘটনার প্রকৃত নির্দেশদাতা কে তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই পার না পায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে রোববার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, হামলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও একজন সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই দিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ভবনটি পরিদর্শন করেন এবং দখলদারদের সাইনবোর্ড ভেঙে দেন। আসিফ মাহমুদ ক্ষমতাসীন দল, স্থানীয় এমপি ও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
দায়িত্বে চরম অবহেলার দায়ে শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে তাকে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার সচিবালয়ে জানান, রাড্ডা ক্লিনিকে হামলায় পুলিশের দায়িত্বহীনতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হচ্ছে। ঘটনার রাতে পুলিশের সামনেই লুটপাটের অভিযোগটি বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন








