মেহেরপুর সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক জহিরুল ইসলাম। ৮ বিঘা জমিতে আমন ধান, কলা, করলা, পেঁয়াজ, ফুলকপি ও শসার আবাদ করেছেন তিনি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি সার পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে পাশের গ্রাম উজলপুরের এক ডিলারের দোকানে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরবেলা মাত্র ৫০ কেজি টিএসপি সার সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এই পরিমাণ সার তার ফসলের চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। তিনি জানান, সংগৃহীত সার থেকে পেঁয়াজের জমিতে ৩০ কেজি এবং করলার জমিতে ২০ কেজি প্রয়োগ করেছেন। ৮ বিঘা জমির জন্য এত অল্প সারে ভালো ফলন পাওয়া নিয়ে তিনি সংশয়ে আছেন। কেন এই পরিস্থিতি, সেটি বোঝা যাবে কৃষক জহিরুল ইসলামের কথায়। সেদিন সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরের দিকে পেয়েছেন ৫০ কেজি টিএসপি সার। বেশির ভাগ জমিতে বছরে একাধিক ফসল আবাদ হয়।
জহিরুলের মতো জেলার অনেক কৃষকই এখন সার সংকটে ভুগছেন। কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। বিসিআইসির ডিলার আবদুল আওয়াল জানান, ১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি মাত্র ৪৩ মেট্রিক টন সার তুলেছেন, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। বরাদ্দকৃত সার ১৫ দিনেই শেষ হয়ে যায়। কুতুবপুর ইউনিয়নের এই ডিলারের ভাষ্যমতে, বর্তমানে আমন আবাদ ও শীতকালীন সবজি চাষ একসাথে চলায় সারের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। তিনি বিসিআইসির (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) ডিলার।
চলতি মৌসুমে মেহেরপুরে ২৬ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হচ্ছে। এক হেক্টরে ৭ দশমিক ৪৭ বিঘা হিসেবে জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২ লাখ ১ হাজার ১৬৭ বিঘা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ১৩ কেজি ডিএপি বা টিএসপি সারের প্রয়োজন। এই হিসেবে শুধু আমনের জন্যই ২ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন সারের দরকার। অথচ সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ২ হাজার ১৯৭ মেট্রিক টন। এর ফলে ধান ও সবজি চাষের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (শস্য) শায়খুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে মেহেরপুরে আমন ধানের আবাদ হয়েছিল ২৬ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে। মেহেরপুর জেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, জেলায় প্রায় ৫৮ হাজার ৫০৭ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে। কোথাও কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করছেন, কোথাও চারা রোপণ করা হয়েছে, কোথাও চারা গাছের আকৃতিতে রূপ নিয়েছে।
শীতকালীন সবজি চাষের পরিস্থিতি আরও জটিল। জেলায় ৪ হাজার ৬৪৭ হেক্টর জমিতে এবার সবজি চাষ হচ্ছে। বিঘাপ্রতি ৩০ কেজি সার হিসেবে ৩৪ হাজার ৭১৩ বিঘা জমির জন্য প্রয়োজন ১ হাজার ৪১ মেট্রিক টন সার। কুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক জামিরুল ইসলাম জানান, ১ বিঘা ফুলকপির জমিতে ৪০০ কেজি সার প্রয়োজন, অথচ তিনি এখনো ৫০ কেজি সারও জোগাড় করতে পারেননি। এছাড়া বাজারে অনুমোদিত বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকার বদলে ২ হাজার টাকা দাম হাঁকা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাংনী উপজেলার গাড়াডোব এলাকার কৃষক হামেদ মিয়া জানান, এলাকায় ডিলার থাকলেও চাহিদামতো সার পাওয়া যায় না। তিনি সবজি চাষে কৃষি অফিসের সুপারিশকৃত ৩০ কেজির চেয়ে অনেক বেশি সার ব্যবহারের প্রয়োজন মনে করেন, যা কৃষি বিভাগের নির্দেশনার সাথে কৃষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বড় পার্থক্যের প্রতিফলন। সবমিলিয়ে কলা চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ সারের চাহিদাসহ জেলায় ডিএপি ও টিএসপির মোট প্রয়োজনীয় মজুত ডিলার পর্যায়ে নেই। জেলায় ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হচ্ছে, যেখানে বিঘাপ্রতি ২০০ কেজি সার হিসেবে ৫ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন সারের প্রয়োজন হয়।
বিএডিসির ১১১ জন ও বিসিআইসির ৩৫ জন ডিলার থাকলেও সারের সংকট কাটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একসময়ে জেলায় প্রায় ৩ হাজার অনিবন্ধিত খুচরা দোকান থেকে কৃষকরা সার সংগ্রহ করতে পারতেন, যার বেশিরভাগই এখন বন্ধ। সার ব্যবসায়ী সোরাব হোসেনের মতে, আগে যশোরের নওয়াপাড়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সার এনে বিক্রি করা সম্ভব হতো, কিন্তু এখন সুযোগ কমে যাওয়ায় কৃষকদের পুরোপুরি ডিলারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
মেহেরপুর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, সারের বরাদ্দ ও বিতরণের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। তবে কৃষি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে সতর্ক করে কৃষকদের সুষম ও পরিমিত সার ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন।
সূত্র: প্রথম আলো








