নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মানুষের প্রাণের দাবি সান্তাহার-রহনপুর রেলপথ প্রকল্পটি ১১৬ বছর পার হলেও আজও বাস্তবে রূপ নেয়নি। উত্তরাঞ্চলের এই অবহেলিত জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ১৯১০ সালে গণদাবির মুখে তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে প্রথমবারের মতো এই রেলপথ নির্মাণের জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করে। সে সময় জরিপ দলের প্রধান ডেলগ্রীন অবিলম্বে এই রেলপথ নির্মাণের জোরালো সুপারিশ করেছিলেন। ১১৬ বছরেও চালু হয়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জে সান্তাহার-রহনপুর রেললাইন প্রকল্প।
দেশ ভাগের পর ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রেলওয়ে বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে নতুন করে আশা জাগে স্থানীয়দের মনে। গঠিত নতুন জরিপ দলের নেতৃত্বে থাকা আশরাফ আলী অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৬৪ সালে ১৯৪ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ও ব্লু-প্রিন্ট তৎকালীন গভর্নরের কাছে হস্তান্তর করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬৬ মাইল দীর্ঘ এই রেলপথে ব্রড ও মিটার গেজ উভয় ধরনের লাইন স্থাপনের কথা ছিল। নওগাঁর সান্তাহার থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পর্যন্ত ১১টি স্টেশন ও দুটি সেতু নির্মাণের নকশা করা হয়েছিল। নির্ধারিত স্টেশনগুলোর মধ্যে নওগাঁ শহর, হাঁপানিয়া হাট, হযরতপুর, জাহাঙ্গীরাবাদ, মহিষবাথান, নজিপুর, মধইল, সাপাহার, পোরশার সারাইগাছী বাজার, বেজোড়া ও দাদপুর স্টেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া ছোট যমুনা ও আত্রাই নদীর ওপর দুটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল প্রকল্পে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর থেকে উত্তরাঞ্চলের জনগণের এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রেলওয়ে বোর্ড ১৯৬৩ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনরায় কাজ শুরু করে।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরেও অজানা কারণে রেলওয়ে বোর্ড প্রকল্পটি মাঝপথে বন্ধ করে দেয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সংসদে আবুল কালাম আজাদ ও মোজাফ্ফর রহমান চৌধুরীর মতো জনপ্রতিনিধিরা এই প্রকল্পটির দাবি তুললেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও প্রকল্পটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু এরপর চার দশক পেরিয়ে গেলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ অঞ্চলে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও রেলওয়ে বোর্ড রহস্যজনকভাবে হঠাৎ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় সান্তাহার-রহনপুর রেলপথ প্রকল্পটি নিয়ে সেই সময় ব্যাপক আলোচনাও হয়েছিল।
স্থানীয়দের মতে, এই রেলপথটি চালু হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের উৎপাদিত ধান, আম, পাট, আখ, গমসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য পরিবহন সহজ হতো। মাল্টা, বরই ও পেয়ারার মতো উদ্যানজাত ফসলের বিপণনেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতো। দীর্ঘদিনের এই অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতায় নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন থমকে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








