সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি অন্যতম ভয়াবহ হামলার ঘটনা, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত জানা গেছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে এক নতুন মোড় নিল। হতবিহ্বলজনক এই বিপুল মৃত্যু সেখানে এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। গত এক বছরে উপসাগরীয় অঞ্চল নতুন এক অস্থিরতার যুগে ঢুকে পড়েছে, যা সাময়িক নয় এবং কোনোভাবেই পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলা নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর আগে গত বছর দোহায় একটি ইসরায়েলি হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক নিহত হন। সেই ঘটনায় কোনো ধরনের পূর্বসতর্কতা বা সমন্বয় ছিল না, যা দীর্ঘদিনের এই অঞ্চলে বিরাজমান নিরাপত্তাবেষ্টনী ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ধারণাটি ভেঙে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইরানকেন্দ্রিক সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়া জিসিসিভুক্ত দেশগুলো এখন তেহরানের প্রতিশোধমূলক কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে। গাজা ও ইরানের তুলনায় এখানে হতাহতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। প্রথম অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এক বছর আগে।
ইরান সমর্থিত হুতিদের এই সামরিক তৎপরতা সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। তেহরান এসব দেশের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র এবং পানি শোধন প্ল্যান্টসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে, দীর্ঘসময় স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং বিমানবন্দর ও আকাশপথ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এতদিন পর্যটন, ক্রীড়া এবং বিনোদনের বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার যে বিশাল বিনিয়োগ ও স্বপ্ন দেখেছিল, সাম্প্রতিক এই অস্থিতিশীলতা সেই ভাবমূর্তিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। ফর্মুলা ওয়ান বা বক্সিংয়ের মতো বিশ্বমানের আয়োজনে বিলিয়ন ডলার খরচ করা হলেও মাত্র কয়েকটি ড্রোনের আঘাতে সব অর্জিত সাফল্য নস্যাৎ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই সংঘাতের শিকড় ২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে প্রোথিত। সে সময় ইরান সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানা দখল করলে সংকট ঘনীভূত হয়। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি জোট হুতিদের দমাতে সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০২২ সাল নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি হয়নি। ইয়েমেনের এই দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পরিস্থিতি এবং বর্তমানে ট্রাম্প-ইরান যুদ্ধের টানাপোড়েন পুরো অঞ্চলকে এক নতুন ও বিপজ্জনক শত্রুতার যুগে নিয়ে এসেছে, যা কাটিয়ে ওঠা এই দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রথম দর্শনে এটি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তার এই ধারাবাহিক অবক্ষয় পুরো অঞ্চলকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা সেখানকার শাসকদের পক্ষে হজম করা কঠিন।
সূত্র: গালফ বাংলা








