ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন এক্সপ্রেসওয়ের তুলনায় এই প্রকল্পে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তথ্যানুসারে, চীনের সিচুয়ান প্রদেশে দুর্গম পাহাড় কেটে নির্মিত ইবিন-পানঝিহুয়া উড়াল সড়কের কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে ৩৬৫ কোটি টাকা। ভারতের আট লেনের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে খরচ হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ৩২০ কোটি টাকা এবং ইন্দোনেশিয়ার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৩৯০ কোটি টাকা। অথচ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কিলোমিটার প্রতি খরচ দেখানো হয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এই অস্বাভাবিক ব্যয়ে প্রকল্প ঘিরে নানা জল্পনার পাশাপাশি সরকারি অর্থ লোপাটের তথ্য সামনে এসেছে। সংসদে সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম খুঁজতে কাজ করছে দুদক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের অধিকাংশ জমি ও স্থাপনার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বাড়িয়ে ভ্যালুয়েশন করা হয়েছে। প্রকল্পে অন্তত ৫০-এর অধিক ভুয়া অধিগ্রহণ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মো. মিজানুর রহমান সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের প্রধান ক্রীড়নক ছিলেন গণপূর্ত সাভার সার্কেলের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান। সরজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার থেকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরের স্থাপনাও অধিগ্রহণ তালিকায় রাখা হয়েছে। কিছু ভবন মূল সড়ক থেকে ২০-২৫ ফুট দূরে থাকার পরেও সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেই সুবাদে তিনি অধিগ্রহণের সময় শতাধিক স্থাপনা জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। তৈয়বপুর মৌজায় আরএস ৫৩৫, ৫৩৬, ৫৪৩, ৫৪৫, ৫৪৭, ৫৬২, ৮০০, ৮১১, ৮১৭, ৮১৮, ৮১৯, ৮২৪, ৮২৫, ৮২৬, ৮২৯, ৮৩১, ৮৩২ নম্বর দাগে ভূমি ও দালানকোঠা অধিগ্রহণ করে কয়েকশ’ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। এছাড়া বাইপাইল মৌজায় আরএস ১৯১, ২১১, ২১৩, ২১৪, ৮৪৫, ৮৪৬ দাগে অধিগ্রহণেও সীমাহীন লুটপাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এমন অন্তত ১০টি দাগের কাগজপত্র পেয়েছে। কোন ভবনে কতো টাকা ক্ষতিপূরণ দেখানো হয়েছে, কাদের নামে অ্যাওয়ার্ড হয়েছে এবং এল.এ শাখা থেকে কারা বিল তুলে নিয়েছে, এর সমস্ত কাগজপত্র হাতে সংরক্ষিত আছে। এতে হুহু করে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরে ঢাকা ডিসি অফিসের এল.এ শাখা থেকে ২০২৫ সালের ১৭ই জুলাই তাদের নামে চেক ছাড় করা হয়। তিনি পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। এ কাজে মিজানুর রহমানকে ডিসি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার সহায়তার প্রমাণ পেয়েছে। ২০২৩ সালের ১৮ই অক্টোবর সেই বিলের টাকাও তুলে নেয়া হয়। ভবন দু’টির সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ের কোনো স্পর্শও লাগেনি। অথচ ভবনের বেলকনির কিছু অংশ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে রাখা হয়েছে। এমনকি মূল সড়ক থেকেই ভবন দু’টি অনেক দূরত্বে অবস্থিত।
মিজান সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতি
পুরো প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি ধরা পড়েছে এক্সপ্রেসওয়ের বাইপাইল অংশে।
এল.এ কেস নং-০৩.১৫.১০/২০১৯-২০২০ এর আর.এস ২১২ নম্বর দাগে নজিরবিহীন লুটপাট চালানো হয়েছে। উপায়ান্তর না পেয়ে ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে রিট করেন।
এই দাগের ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে স্থাপনা মালিক আওলাদ হোসেনসহ আরও ৬ জন রয়েছেন।
তাদের অনুকূলে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১ টাকা ক্ষতিপূরণের টাকা গত ১৪ই জুলাই ডিসি অফিস থেকে দোকান মালিকদের নামে ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখায় খোলা হিসাবে জমা দেওয়া হয়।
পরদিন ১৫ই জুলাই মিজানুর-আশরাফুল আলমের ব্যাংক হিসাবে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ট্রান্সফার হয়। একই দাগের এওয়ার্ড নম্বর ২৪/১-এর অনুকূলে আরেকটি জমির বিল বাবদ ১ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার ১০৮ টাকা তুলে নেন মিজান। অধিগ্রহণের সময় গণপূর্তের প্রকৌশলী ও কিছু দালালদের ৪০ শতাংশ টাকা কমিশন দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় স্বপন ভুঁইয়া ও মোস্তফা হাজীর মাধ্যমে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে বিল তৈরি করতেন মিজান। পরে বিল পাওয়ার পর মিজানের কমিশনের টাকা পরিশোধ করা হতো। পাশের আরএস ২৯৯ নম্বর দাগে ৩০ ও ৩১ নম্বর এওয়ার্ডে শেখ মিজানুর রহমানের নামও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২৩২ কোটি টাকা লুটের তথ্য পাওয়া গেলেও দুদক মনে করছে, ভুয়া অধিগ্রহণের এই অংক হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। জুলাই আন্দোলনের পর কিছু অভিযোগ সামনে আসায় মিজানকে সাভার থেকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ তে বদলি করা হয়। এরপর সংসদ সচিবালয় হয়ে জুলাই জাদুঘরের দায়িত্ব পান। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-২ তে কর্মরত আছেন। ইউসিবি ব্যাংক পল্লী বিদ্যুৎ শাখায় মিজানুর রহমানের একাধিক ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এ ছাড়া মমতাজ কনস্ট্রাকশন এবং ভাই কামরুজ্জামানের নামেও হিসাবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসবের নথিপত্র কাছে রয়েছে। এছাড়াও বাইপাইল মৌজার আরএস ২১২ নম্বর দাগের মতো অনেকগুলো দাগে সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এসব স্থাপনার মাত্র ২ থেকে ৩ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডারে জড়িয়েছে, বাকি অংশ অক্ষত থাকা সত্ত্বেও পুরো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে। ভুয়া অধিগ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে যাতে সরকারি খাতের বড় অংকের অর্থ সরাসরি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়। দুদক সূত্র জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে আরও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই লুটপাটের সাথে জড়িত অন্যদের নামও বেরিয়ে আসবে। এই জালিয়াতি চক্রটি সরকারি নথিপত্রে কারসাজি করে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বিতর্কিত করে তুলেছে। একই কায়দায় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৪ নম্বর অ্যাওয়ার্ডের স্থাপনা মালিক শামসুন্নাহার রেখাসহ তার ৭ ভাইবোনের নামে পাস হওয়া ২২ কোটি ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৭ টাকার বিলও কাগজ জালিয়াতি করে নিজের নামে তুলে নেন প্রকল্পের ভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। উক্ত অ্যাওয়ার্ডের অনুকূলে মিজানুর রহমান প্রথমে প্রায় দশগুণ বাড়িয়ে সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা বিল তৈরি করলেও পরে ডিসি অফিসের আপত্তিতে তা সংশোধন করে ২২ কোটি করা হয়। একই দাগে ৪৬ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি দোতলা ভবন অধিগ্রহণ দেখিয়ে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বিল তুলে নেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৫ নম্বর অ্যাওয়ার্ডধারী নাজমুল হোসেন ভূঁইয়াসহ আরও ১১ জন ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের সঙ্গে। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের অনুকূলে পাস হওয়া ১৯ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯ টাকার বিল আটকে দেন মিজানুর রহমান। উক্ত দাগে অধিগ্রহণের সকল প্রক্রিয়া শেষে ভুক্তভোগীদের বিল উত্তোলনের কয়েক মাস আগে মিজানুর রহমান স্থাপনা থাকা জমি মালিকের কাছ থেকে ৩৬ শতাংশ জমির মাত্র ২ শতাংশ রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে হাইকোর্ট ভুক্তভোগীদের পক্ষে রুল ইস্যু করেন। এরপরও ভিকটিমরা প্রকৌশলী মিজানের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। পরে ভুক্তভোগীদের উক্ত বিলের সাড়ে ১৯ কোটি টাকা থেকে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা মিজানের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার হয়। যার এওয়ার্ড নম্বর ৫ এর অনুকূলে ২১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯২ টাকা এবং এওয়ার্ড নম্বর ৪৪ এর অনুকূলে ২ কোটি ১১ লাখ ২ হাজার ৬৪২ টাকা। এ ছাড়া, প্রকল্পের আরএস ২৯৮ নম্বর দাগে আশুলিয়া গাজীরচট ডিইপিজেড রোড বাইতুন নুর মসজিদের অপরপাশে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির তানভির কমপ্লেক্স ও এর পাশে আরেকটি ভবন অধিগ্রহণ দেখানো হয়। স্থাপনা বিল করা হয় ৬৭ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪২ টাকা। ভবন মালিক আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার ভবন অধিগ্রহণের বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না।
সূত্র: মানবজমিন








