সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম: খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় সংসদীয় কমিটি

প্রকাশ:

সারা দেশে সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ সার ডিলার নিয়োগের নির্ধারিত নীতিমালায় স্পষ্টভাবেই আবেদনকারীর যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালীদের স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের ডিলারশিপ দেওয়া হচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার বিষয়টি উল্লেখ করা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় সুপারিশকেই তালিকা তৈরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও সারের ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

ডিলার নিয়োগের এই অনিয়ম নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার যৌক্তিক সুপারিশ করেছে। কমিটির বৈঠকে সংসদ সদস্যদের একাংশ গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যেসব স্থানে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আপাতত ডিলারশিপ কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সরকার দ্রুত কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। খবর জানাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেন। আমরা মনে করি, দ্রুত এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারকে ন্যায্য ও কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জেনেশুনে সরকার কেন এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে।

সারাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার পদের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ডিলারদের যে আংশিক তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে মাঠপর্যায়ে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২২ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জনই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। অথচ এঁদের প্রায় কারও সার ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। একইভাবে, এক থেকে দুই যুগ ধরে ব্যবসা করে আসা দক্ষ ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন তালিকা থেকে। শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, সারা দেশের চিত্রই কমবেশি এ রকম। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।

গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জমা দেওয়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এই ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে; যেখানে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পছন্দের লোকদের জায়গা করে দিতে প্রভাবশালীদের চাপ প্রয়োগের ঘটনাও নতুন নয়।

সার পরিবহন ও বিতরণে এই ধরনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে। আমন মৌসুমে সার না পাওয়ায় এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে গুদাম ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির এই সময়ে সারের সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটলে তা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। সার ও কৃষি উৎপাদনে রাজনৈতিক বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই, তাই নীতিমালা অনুযায়ী স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে কৃষকদের ভোগান্তি ও উৎপাদনের খরচ—দুই-ই বাড়ে।

শেয়ার করুন