শরতের কয়েকটি ঝলমলে দিনের পর টাইফুনের প্রভাবে টোকিওতে ফিরে এসেছিল টানা বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেই গত সোমবার সন্ধ্যায় পর্দা উঠেছে ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। বৃষ্টিভেজা লালগালিচা, বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক দর্শকদের উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে পুরো উদ্বোধনী আয়োজন। পরদিন মঙ্গলবার থেকে পুরোদমে শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। জাপানের রাজধানীর হিবিয়া, ইউরাকুচো, মারুনৌচি ও গিনজা এলাকায় এখন চলচ্চিত্রের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই সুবিশাল আয়োজন। বিশ্বের নানা প্রান্তের বিখ্যাত নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে টোকিও। কেবল সিনেমা প্রদর্শনই নয়, আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনা বৃদ্ধি, নতুন প্রতিভার বিকাশ এবং জাপানি চলচ্চিত্রের বিশ্ববাজার সম্প্রসারণের বিষয়গুলোও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের আসরে। জাপানি চলচ্চিত্রের শিল্পী ও নির্মাতাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াভিত্তিক প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা রলফ ডি হিয়ার। তিনি জানান, চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ ও সততা বজায় রেখেই বিচারকেরা সিদ্ধান্ত নেবেন। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করে তিনি বলেন, ‘সিনেমা আমাকে কখনোই ক্লান্ত করে না। সেই আনন্দই দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।’।
বৃষ্টিভেজা লালগালিচা ও বিশ্বতারকাদের উপস্থিতি
উৎসবের প্রথম দিনে টোকিও মিডটাউন হিবিয়ার স্টেপ স্কয়ারে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য লালগালিচা পর্বের। ভারী বৃষ্টি উপেক্ষা করে বর্ষাতি পরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন হাজারো আন্তর্জাতিক দর্শক। অন্যদিকে আমন্ত্রিত অতিথি ও তারকারা লালগালিচায় হাজির হন উৎসবের বিশেষ লোগোসংবলিত স্বচ্ছ ছাতা হাতে। উৎসবের অফিশিয়াল নেভিগেটর নাকাজিমা কেনতো অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন এটি এক প্রাণসঞ্চারী বৃষ্টি।’ উৎসবের মূল ১১টি বিভাগের চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি অতিথিদের পাশাপাশি লালগালিচায় হেঁটেছেন চারটি প্রধান প্রতিযোগিতা বিভাগের সম্মানিত বিচারকেরাও। উৎসব পরিচালক হিসামাৎসু তাকেও স্মরণ করেন প্রায় ৫০ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে দেখা দেশি-বিদেশি অসংখ্য ছবির কথা।
উদ্বোধনী দিনের লালগালিচায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের রূপালী জগতের বৈচিত্র্যময় চিত্র ফুটে ওঠে। উত্তর মেসিডোনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পরিচালক মিলচো মানচেভস্কির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কাভার’ ছবির জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী সারা ক্লিমোস্কা ও ফিলিপ ত্রাইকমোভিক। চীনা আন্তর্জাতিক পরিচালক চিউ জিয়ংজিয়ং এবং অভিনয়শিল্পী ওয়াং হি ও শু শুচুয়ান অংশ নেন ‘ফুক্সি: ফোর টেলস অব ফিস্টিং’ ছবির প্রতিনিধি হিসেবে। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা বাহমান ঘোবাদি এবং তাঁর ‘ট্রিজ আর ওয়াচিং’ ছবির কলাকুশলীরা। ফুটবল মাঠের ভয়াবহ সংঘাত ও বিয়োগান্ত ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘হেইসেল ৮৫’ ছবির প্রতিনিধিত্ব করেন বেলজিয়ামভিত্তিক যৌথ পরিচালক তেওদোরা আনা মিহাই ও অভিনেত্রী ভায়োলেট ব্রেকম্যান। লালগালিচার শেষভাগে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ‘সুকিয়াকি’র তারকা অভিনয়শিল্পী ওকাদা জুনইচি, মাতসুজাকা তোরি, সেইনো নানা এবং পরিচালক জেজে তাকাহিসা। অস্কার প্রদানকারী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল ক্রেমারসহ সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার পরিচালক গারিন নুগ্রোহো ও অভিনেতা নিকোলাস সাপুত্রা আসেন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের চলচ্চিত্র ‘রেড বিফোর ডন’ নিয়ে। লালগালিচার আনুষ্ঠানিকতা শেষে অতিথিরা যোগ দেন পাশের হিউলিক হলে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তাঁর সঙ্গে বিচারক হিসেবে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযোজক ওহ জুংওয়ান, ফ্রান্সের ডিআই কালারিস্ট ইয়োভ মুর, প্রযোজক অ্যালেক্স লো ও জাপানি অভিনেত্রী ওয়াতানাবে মাকিকো। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত জাপানি গান ‘উয়ে ও মুইতে আরুকো’ আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে ‘সুকিয়াকি’ নামে পরিচিতি পায়। প্রথম জাপানি ভাষার গান হিসেবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকার শীর্ষে টানা তিন সপ্তাহ অবস্থান করে। চলচ্চিত্রে সুরকার নাকামুরা হাচিদাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওকাদা জুনইচি। গীতিকার এই রোকুসুকের চরিত্রে মাতসুজাকা তোরি এবং গায়ক সাকামোতো কিউয়ের ভূমিকায় দেখা গেছে নাকানো তাইগাকে। এতে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম, আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ ও সাবেরী আলম।
চলচ্চিত্রশিল্পে সরকারি সহায়তা ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি
উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতায় জাপানের চলচ্চিত্র ও কনটেন্ট শিল্পের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই। তিনি জানান, বর্তমানে বৈদেশিক বাজারে জাপানের কনটেন্ট শিল্পের রফতানি ও বিক্রি প্রায় ৬ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। ফলে খাতটি জাপানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরপর এক বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে যুক্ত হন জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, চলচ্চিত্র দেশের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মানুষকে মানসিকভাবে যুক্ত করে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- জাপানি চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বমানের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
- চলচ্চিত্রসহ কনটেন্ট শিল্পকে জাপানের জাতীয় প্রবৃদ্ধি কৌশলের ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ খাতের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্র প্রসারে জাপানি নীতি জোরদার করা হচ্ছে।
১০ দিনব্যাপী উৎসবে ২০৪টি সিনেমার বিশ্ব প্রদর্শনী
২৬ অক্টোবর শুরু হওয়া ১০ দিনব্যাপী এই উৎসব আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত অবিরত চলবে। এবারের আসরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বাছাই করা ২০৪টি সেরা চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ছাড়াও রয়েছে প্রখ্যাত নির্মাতাদের নিয়ে মাস্টারক্লাস, সিম্পোজিয়াম, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং টিআইএফএফ লাউঞ্জে বিশেষ জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা। উৎসবের শীর্ষ সম্মাননা ‘টোকিও গ্রাঁ প্রির’ জন্য মূল প্রতিযোগিতায় লড়ছে বিশ্বমানের ১৫টি চলচ্চিত্র। এসব ছবি নির্বাচনের জন্য ১১২টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় দুই সহস্রাধিক আবেদন জমা পড়েছিল। প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রেম, রাজনীতি, ভৌতিক গল্প, সামাজিক রূপান্তর ও সংঘাতময় বাস্তবতার গল্প স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো আলোনসোর ‘ডাবল ফ্রিডম’ এবং ইতালির সামুয়েলে রোসির ‘ইভেন ইফ হেল কেইম’। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই পক্ষের সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। ১০ দিনে ২০৪ চলচ্চিত্র ২৬ অক্টোবর শুরু হওয়া উৎসব চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। বিশ্বের ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি ছবির মধ্য থেকে এগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। এতে উঠে এসেছে গানটির সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পীর জীবন, সৃজনশীল সহযোগিতা, সংগ্রাম এবং পারস্পরিক মতপার্থক্যের নানা ঘটনা। প্রতিযোগিতায় রয়েছে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো আলোনসোর ‘ডাবল ফ্রিডম’, ইতালির সামুয়েলে রোসির ‘ইভেন ইফ হেল কেইম’, সিঙ্গাপুরের সুন শুনের ‘ম্যাজিক অ্যাটলাস’, পর্তুগালের সের্জিও গ্রাসিয়ানোর ‘মেমোরিজ অব প্রিজন’, ইরানের বাহমান ঘোবাদির ‘ট্রিজ আর ওয়াচিং’, সার্বিয়ার। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকার এক হবু কনের গল্প।
মূল প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক বাজার
টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দীর্ঘ চার দশকের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়াইয়ের জন্য মনোনীত হয়েছে। ঐতিহাসিক এই গৌরব অর্জন করেছে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ৮৮ মিনিটের ছবিটি এর আগে বিশ্বখ্যাত ভেনিস ও টরন্টো উৎসবে প্রশংসিত হয়। টোকিও উৎসবে ৩১ অক্টোবর তোহো সিনেমা চ্যানটারে, ১ নভেম্বর হিউলিক হলে এবং ২ নভেম্বর হিউম্যানট্রাস্ট সিনেমা ইউরাকুচোতে ছবিটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রসার ও অর্থায়নের জন্য শুরু হয়েছে ‘টিফকম’ বাজার, যেখানে ‘টোকিও গ্যাপ ফিন্যান্সিং মার্কেট’-এ বিশ্বের ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন প্রকল্প অংশ নিচ্ছে। বিভক্ত ও সংঘাতময় এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে সংস্কৃতিচর্চার একসূত্রে গাথার সুযোগ তৈরি করছে টোকিওর এই জমকালো আন্তর্জাতিক আয়োজন। প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত তিন জাপানি চলচ্চিত্র—ইকেদা আকিরার ‘দ্য ক্যানারিস লালাবাই’, মিশিমা ইউকিকোর ‘টু সিগারেটস, থ্রি নাইটস’ এবং ইয়ামামোতো আকিরার ‘দ্য ইন্টারটুইনিং’–এর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলা কর্মসূচিতে থাকছে সেমিনার, প্রকল্প উপস্থাপনা এবং বিভিন্ন দেশের প্রযোজক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ।
সূত্র: প্রথম আলো








