ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের প্রাপ্ত প্রাথমিক ফলাফলে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই ১২০ আসনের পার্লামেন্টে (নেসেট) সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি, যার ফলে দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার হারজগ বলেন, ‘একটি বিষয় বুঝতে হবে—নির্বাচনের আগেও আমি এ কথা বলেছিলাম। গতকালের নির্বাচনের পর তো অবশ্যই, নতুন করে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে আমাদের সবকিছু করতে হবে।’। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি। আইজেনকোট নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত ৯০ দশমিক ২ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি এবং বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। তবে এই হিসাব চূড়ান্ত নয়; কারণ সেনাসদস্য, কারাবন্দি, হাসপাতালে থাকা রোগী এবং নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালটগুলোর গণনা এখনো বাকি রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলে এসব ভোটের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বুধবার সন্ধ্যায় পাঁচ মিলিয়নের বেশি ভোট গণনা করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের ব্যালট—যা ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালট নামে পরিচিত—তখনো গণনা করা বাকি ছিল। তবে এ ধরনের সমীকরণে বিরোধী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৬টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
তার জোটের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, শাস এবং ওতজমা ইয়েহুদিত সাতটি করে এবং রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি ছয়টি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২১টি, নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াখাদ ১২টি, ইয়ার গোলানের দ্য ডেমোক্র্যাটস আটটি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু সাতটি আসন পেতে পারে। এদিকে ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল এবং ইয়োয়াজ হেন্ডেলের দ্য রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি নির্বাচনে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের ন্যূনতম সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হতে পারে।
নির্বাচনে আরব ভোটারদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণের কারণে তাদের সমর্থন সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
বিরোধী নেতা ইয়ার গোলান দাবি করেছেন, আরব দলগুলোকে হিসেবে নিলে বিরোধী পক্ষের আসনসংখ্যা ৬৫-তে পৌঁছায়, যেখানে নেতানিয়াহুর পক্ষের আসন মাত্র ৫৫। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজনমূলক রাজনীতির সমাপ্তি ঘটেছে এবং তিনি নির্বাচনে হেরেছেন। এমনকি মেয়াদ ভাগাভাগি করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে বিরোধী জোটে আরব দলগুলোকে নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনার পর অনেক বিরোধী নেতা আরব দলগুলোকে সরকারে যুক্ত করার বিরোধিতা করছেন। বিশেষ করে লিবারম্যান এবং বেনেট এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এর ফলে গোলানের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা জোটের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সকল রাজনৈতিক নেতাকে খোলা মনে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন করে নির্বাচন এড়াতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ভবনে আলোচনার জন্য আসা সবাইকে পূর্বশর্তহীনভাবে বসতে হবে। আইন অনুযায়ী, সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার আগে নেসেটের বিভিন্ন দলের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আলোচনায় অংশ নিতে আসা প্রত্যেকেরই খোলা মন নিয়ে আসা উচিত। বিষয়টি তখন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। গত আগস্টে তিনি সাবেক ইয়েশ আতিদ সংসদ সদস্য ইয়োভ সেগালোভিৎসকে দলের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রাখার ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আরব দলগুলোও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন জানিয়েছেন, তাদের দল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার যেকোনো প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত। এছাড়া হাদাশ-তাআল সদস্য আহমাদ তিবি বিরোধীদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তাদের সাহস থাকলে তারা সরকার গঠন করতে পারবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২১ সালের ন্যায় এবারও কোনো আরব দল সরকারে যোগ দেবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে রাআম চেয়ারম্যান মানসুর আব্বাস তার দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ইহুদি প্রার্থীকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল গ্রহণ করেছেন। সব মিলিয়ে, কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন করে নির্বাচন হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনাও বর্তমানে খুবই ক্ষীণ। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ইতিহাসে একটি আরব দল—রাআম—জোটের অংশ হয়েছিল। রাআমের চেয়ারম্যান মানসুর আব্বাস অবশ্য তার দলকে সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








