২০২৬ বিশ্বকাপ: মেসিকে বোমা হামলার হুমকি ও রোনালদোকে ঘিরে নিরাপত্তা আতঙ্ক

প্রকাশ:

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে সুরক্ষিত আসর হিসেবে দাবি করা হলেও, এর পেছনের ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি ও গোপন নথিপত্র সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সান’ এবং স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘প্রেনসা ইবেরিকা’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মার্কিন পুলিশ ও ফিফার গোপন ডসিয়ারে টুর্নামেন্ট চলাকালীন তারকা ফুটবলারদের ঘিরে থাকা সন্ত্রাসী হুমকি ও মৃত্যুর আশঙ্কার চিত্রটি ছিল ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং অংশ নেওয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) বিশ্বকাপজুড়ে প্রতিদিন এই নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করত।

টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকিগুলো আবর্তিত হয়েছিল। জর্ডানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে এক ব্যক্তি হ্যান্ড গ্রেনেড ও রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামে হামলার হুমকি দেন। তিনি পুলিশ ও খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বিশেষভাবে মেসিকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক সন্দেহভাজন আটলান্টা স্টেডিয়ামে শরীরে চারটি বোমা বেঁধে মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। একই ম্যাচের সময় স্টেডিয়ামের ডাস্টবিনে তিনটি বোমা রাখা আছে বলে জরুরি সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল, যদিও তল্লাশিতে কোনো বিস্ফোরক মেলেনি।

নিরাপত্তাহীনতা থেকে রেহাই পাননি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও। গত ১৪ই জুন এক ব্যক্তি পর্তুগিজ তারকার হোটেলের গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। আরেকটি ঘটনায় এক ভক্ত জোর করে রোনালদোর হোটেলে ঢুকে লিফটে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে আটক করে; পরে জানা যায় তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল একটি সেলফি তোলা। ম্যাচ পরিচালনায় থাকা রেফারিরাও চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের হোয়াটসঅ্যাপে ছয় হাজারের বেশি প্রাণনাশের হুমকি পান। এছাড়া ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) উইলি দেলাজোদও মিশরীয় সমর্থকদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন।

মাঠের পারফরম্যান্সের কারণেও খেলোয়াড়রা হুমকির মুখে পড়েছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারের পর সতীর্থ আর্লিং ব্রুট হালান্দকে পাস না দেওয়ায় নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ ও তার স্ত্রী প্রাণনাশের হুমকি পান। পেনাল্টি মিস করায় কলম্বিয়ার উইঙ্গার ঝন জামিন্টন কামপাজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় নিজ দলের সঙ্গে বিমানে দেশে ফিরতে পারেননি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার আন্দ্রেস এস্কোবারের ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি যেন এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছিল। এছাড়া প্যারাগুয়ে ম্যাচের পর কিলিয়ান এমবাপ্পের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো ও বর্ণবাদী আক্রমণের ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

দক্ষিণ কোরিয়া দলও এই নিরাপত্তা সংকটের বাইরে ছিল না। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর কোচ হং মাইওং-বো ও পুরো দলকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, যার ফলে তাদের কড়া পুলিশ পাহারায় বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে হয়েছিল। এমন নজিরবিহীন হুমকির মুখে ইংল্যান্ড দল তাদের মিডিয়া সেন্টারকে কংক্রিটের ব্যারিকেড, স্নাইপার-বিরোধী স্ক্রিন ও তিন স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে একটি দুর্গে পরিণত করেছিল। এছাড়া ড্রোন হামলা ঠেকাতে জারি করা হয়েছিল নো-ফ্লাই জোন।

আর্জেন্টিনা ও মিশর ম্যাচের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের হোয়াটসঅ্যাপে ৬ হাজারের বেশি প্রাণনাশের হুমকি পান।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোল করার পর কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এস্কোবারের ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি যেন এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে আবার ফিরে আসে।

একই ধরনের ভয়াবহ হুমকি আসে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও।

তাৎক্ষণিকভাবে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে তল্লাশি চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।

নিরাপত্তাহীনতা ও মৃত্যুর হুমকি থেকে বাদ যাননি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল মিস করা খেলোয়াড়রাও।

শেয়ার করুন