ঢাবি ফজলুল হক হলে শিক্ষার্থী নিরাপত্তা ঘটনায়: প্রভোস্টের পদত্যাগ ও ছাত্রদলের বিচার দাবি ছাত্রশিবিরের

প্রকাশ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে প্রভোস্টের কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের পদত্যাগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হল কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মহিউদ্দিন খান লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান এবং মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফ। তারা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে প্রশাসনের নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, হলের খাবারের মান নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ায় এক শিক্ষার্থীকে প্রভোস্ট নিজের কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় হলের কয়েকজন কর্মচারীও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করে সংগঠনটি। ভুক্তভোগীকে ছাত্রত্ব ও হলের সিট বাতিলসহ সাইবার মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে একটি লিখিত বক্তব্যে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়, যেখানে হল সংসদের নেতাদের প্ররোচনার কথা উল্লেখ করতে বাধ্য করা হয়।

নির্যাতনের ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও হল সংসদের প্রতিনিধিরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দীর্ঘ সময় কালক্ষেপণ করে। কখনো ভিডিও ধারণের সুযোগ নেই, আবার কখনো সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ফুটেজ দেখানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের সব শর্ত মেনে নেওয়ার পরও ফুটেজ দেখানো হয়নি। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও প্রক্টরকে হল অফিস থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়।

হামলায় ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসান, পাঠকক্ষ সম্পাদক মো. তায়েফ, মুজিব হল সংসদের জিএস আহমেদ আল সাবাহ এবং শহীদুল্লাহ হলের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়াসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। ইমামুল হাসানসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। ছাত্রশিবির সভাপতি মহিউদ্দিন খান বলেন, অতীতে ছাত্রলীগ যেভাবে প্রশাসনের হয়ে আন্দোলন দমনে কাজ করত, ছাত্রদল এখন একই ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি অনুসরণ করছে।

সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রদলের মধ্যে একটি অশুভ আঁতাত তৈরি হয়েছে। হল প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের এই নেক্সাস আগের ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফ জানান, প্রভোস্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আড়াল করতেই হল প্রশাসনের প্ররোচনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনকে পদত্যাগ করিয়ে আজীবনের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত কর্মচারী মারুফ ও আরিফ হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের চাকরিচ্যুত করতে হবে। তৃতীয়ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে হামলায় জড়িত ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের স্থায়ী বহিষ্কার ও তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

চতুর্থত, কোনো ছাত্রসংগঠন যাতে প্রশাসনের হয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পেশিশক্তি প্রয়োগ করতে না পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। ছাত্রশিবির নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন