কুড়িগ্রামে শিক্ষক বদলিতে অনিয়ম: চাপের মুখে অসহায় শিক্ষা কর্মকর্তা

প্রকাশ:

কুড়িগ্রাম সদরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্ত-উপজেলা বদলিতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি নীতিমালা পুরোপুরি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে এই বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। অনুসন্ধানে বদলি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অসঙ্গতি ও নীতিমালার লঙ্ঘনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। যারা অভিযোগ তুলেছেন তারা সঠিক বলেননি।’।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকালে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ এই বদলির আদেশ জারি করে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এই কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক বদলির আবেদন করেছিলেন, যার সময়সীমা ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তবে চূড়ান্ত তালিকায় এমন অনেককে বদলি করা হয়েছে যারা আবেদনই করেননি। তাদের চাপে পড়ে কিংবা সুবিধা নিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এই আদেশ জারি করা হয়েছে।

বদলিতে দায়িত্ব পালনকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক দায় স্বীকার করে নিজেকে ‘অসহায়’ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এক সপ্তাহ আগে যোগদান করেছি। আমাকে তালিকা ধরিয়ে দিয়ে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম নীতিমালা মেনে বদলি হোক, কিন্তু চাপের মুখে তা সম্ভব হয়নি। তবে ঠিক কারা চাপ দিয়েছেন তা বলতে পারব না, কারণ এটি আমার চাকরির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’ তিনি বর্তমানে এই বদলি আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের পাঁচটি নির্দেশনার মধ্যে অন্তত চারটিই লঙ্ঘন করা হয়েছে। ১২ জন শিক্ষকের বদলি আদেশের মধ্যে আটজনের ক্ষেত্রেই নীতিমালা মানা হয়নি। তালিকায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, আব্দুর রহিম নামের এক শিক্ষককে এমন বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে যার নাম শূন্য পদের তালিকায় ছিল না এবং তিনি তার পছন্দক্রমেও সেটি উল্লেখ করেননি। এছাড়া মাহমুদা আক্তার নামের এক শিক্ষক বদলির আবেদন না করেও তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮ জন শিক্ষককে নীতিমালা লঙ্ঘন করে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় আরও দেখা গেছে, ২ নং ক্রমিকে থাকা বাশিরুল মুমিন খন্দকারসহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলি দেওয়া হয়েছে। মনিরা আক্তার নামের এক শিক্ষককে প্রকৃত যোগদানের তারিখ ২০১৩ সালের পরিবর্তে ২০১০ সাল দেখিয়ে বদলির সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, যেখানে ৫ জনের কম শিক্ষক কর্মরত আছে এমন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি নিষেধ থাকা সত্ত্বেও সেই নিয়ম মানা হয়নি। বদলির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যে সকল বিদ্যালয়ে ৫ জন বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত আছেন, সে সকল বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। বদলির আদেশে দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন করে ৪ জন শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক বদলির তালিকায় দেখা গেছে, তালিকায় ২ নং ক্রমে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে ২জন শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, ৩ নং ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীন ৩ জনের, ৪ নং তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ৬ জনের এবং ৮নং ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের। বদলির তালিকায় ৫নং ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্যমতে, সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বুধবার দুপুরে দলবল নিয়ে শিক্ষা অফিসে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে তালিকা পরিবর্তন করান। তবে মাহবুবুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি অফিসে গিয়ে কেবল ইউএনও এবং শিক্ষা অফিসারকে ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছি, কোনো চাপ সৃষ্টি করিনি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান দাবি করেন, বিষয়টি তেমন কোনো রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং কিছু সুপারিশ ছিল। তিনি আশ্বাস দেন, বদলি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সেই আদেশ বাতিল করা হবে। শিক্ষক নেতারা অভিযোগ করছেন যে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা এই বদলি বাণিজ্য চালিয়েছেন, যার ফলে প্রকৃত দাবিদার শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

শেয়ার করুন