কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষসহ পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু

প্রকাশ:

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহত অন্যরা হলেন দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের পুত্র স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী। গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে কেনাকাটা ও রাতের খাবার শেষে হোটেলে ফেরার পর মধ্যরাতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, হোটেলের চার তলায় এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং দ্রুত পুরো ভবনে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কলকাতা পুলিশ হোটেল থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করলেও ৯ জনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়, যাদের হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়।

নিহত দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকতায় অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি এশিয়ান টেলিভিশন ও নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। বুধবার সকালে এই সংবাদ কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে সাংবাদিক মহলসহ স্থানীয়দের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, স্ত্রী আফসানার রক্তের কণিকা সংক্রান্ত সমস্যা, তিন বছরের পুত্র স্বর্ণশীষের কথা বলার জড়তা এবং শ্বশুরের বার্ধক্যজনিত চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট দেবাশীষ সপরিবারে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে যান। সেখানে নারায়ণা হাসপাতালে ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে তারা কলকাতায় যাত্রাবিরতি করেন। মঙ্গলবারই তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু কেনাকাটার জন্য একদিন বেশি অবস্থান করায় এই বিপত্তি ঘটে। দেবাশীষের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য যাওয়া তার ভায়রা মিটু ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় আগেই দেশে ফিরে আসায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

দেবাশীষের সাত বছর বয়সী কন্যা মহিমা দেশে দাদা-দাদির কাছে ছিল। মঙ্গলবার রাতে ভিডিও কলে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। বাবা তাকে নতুন জামা ও চকোলেট কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় এখন মহিমার নির্বাক চাহনি আর বৃদ্ধ দাদা-দাদির আহাজারি। দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত জানান, তিনি নিজে হার্টের রোগী এবং তার স্ত্রীও অসুস্থ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দেবাশীষের মৃত্যুতে তারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন।

দীর্ঘ নয় বছরের দাম্পত্য জীবনে দেবাশীষ ও আফসানা দুই ধর্মের হলেও তাদের সংসার ছিল ভালোবাসায় ঘেরা। সেই সুখের সংসারে এখন শুধুই শূন্যতা। বুধবার নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার মরদেহ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মহিমার ভবিষ্যৎ এবং বৃদ্ধ দম্পতির চিকিৎসা খরচ নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্বজনরা এই শোক কাটিয়ে ওঠার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চকোলেট আর খেলনার বদলে অপেক্ষা করছে বাবা-মা আর ভাইয়ের লাশের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশেই একমাত্র পুত্র সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন মা স্বপ্না দত্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশপাশের আত্মীয়স্বজন এই বৃদ্ধ দম্পতিকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব বলে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা স্বপ্না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বুধবার বিকালে কুষ্টিয়া শহরের আরওয়াপাড়ায় যেতেই দেখা গেল, একটি বাসার সামনে শত শত মানুষের ভিড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাসার ভেতর থেকে ভেসে আসছে আহাজারির শব্দ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো, একটি রুমে ছোট্ট মহিমাকে ঘিরে আছে কয়েক সহপাঠী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেয়ালে টানানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

শেয়ার করুন