গাজায় সামরিক অভিযানের গোপন কৌশল ফাঁস: নতুন প্রামাণ্যচিত্রে ইসরায়েলি সেনাদের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

প্রকাশ:

গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো সামরিক অভিযানের নেপথ্যে থাকা গোপন কৌশল ও প্রযুক্তি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্দরের ২৪ জন সদস্যের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’ (NAZA)। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই ছবিটি গোল্ডেন লায়ন পুরস্কারের দৌড়ে রয়েছে। অস্কারজয়ী নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল জোর পরিচালিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি ইসরায়েলি সামরিক কাঠামোর ভেতরের নানা দিক উন্মোচন করেছে।

প্রামাণ্যচিত্রটির নামকরণ করা হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর একটি সংক্ষেপিত শব্দ থেকে, যা সামরিক হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রযোজিত এই ছবিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যারা সরাসরি নজরদারি ও দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিরাপত্তা ও ঝুঁকি এড়াতে তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে চেহারা ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

সাক্ষাৎকারদাতারা জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে হামাসের নিচু স্তরের সদস্যদের চিহ্নিত করা হতো। এরপর পরিবারের সদস্যরাও নিহত হতে পারেন জেনেও রাতের বেলা তাঁদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হতো। নিশানা করা ব্যক্তিদের অবস্থান নিশ্চিত করতে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ফোন হ্যাক করত এবং সপরিবার হামলার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথোপকথন গোপনে শুনত।

ছবিটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন কিছু কর্মকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ বাসিন্দা ঘরে আছেন জেনেও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, সুপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। গোয়েন্দা ইউনিটের একজন সদস্য জানান, সরাসরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরে বার্তা পাঠানো এই ইউনিটের মূল লক্ষ্য ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’।

পরিচালকদের মতে, এই প্রামাণ্যচিত্রটি কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের ওপর আলোকপাত করেনি, বরং সামরিক নির্দেশ, গৃহীত নীতি এবং এই কাঠামোর পেছনের যুক্তিগুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে। জেমস উইলসন ও জোনাথন গ্লেজার প্রযোজিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিন বছর ধরে শ্রমসাধ্য গবেষণার মাধ্যমে সংগৃহীত এই জবানবন্দিগুলোকে উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা ‘যুগান্তকারী’ ও ‘শিউরে ওঠার মতো’ বলে মন্তব্য করেছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এই হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। এই হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।

ইসরায়েলের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি তিন-চতুর্থাংশের বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ায় বেঁচে থাকা মানুষজন বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধাহীন তাঁবুর শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলের এই সামরিক ব্যবস্থাকে জাতিহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

পরিচালকরা জানিয়েছেন, ‘নো আদার ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রের ধারাবাহিকতায় তাঁরা এই নতুন ছবিতে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার নানা সূত্র মিলিয়ে দেখেছেন। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা এই অপরাধের নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করার চেয়ে পুরো ব্যবস্থার চালিকা শক্তিগুলো তুলে ধরাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন ধরনের গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বেরিয়ে এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্দরের ২৪ জন সদস্যের জবানবন্দিতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইসরায়েলের যুদ্ধসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি এড়াতে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রথম প্রকাশিত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘নাজা’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ঝুঁকির কারণে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এটির চিত্রগ্রহণ ও প্রযোজনার কাজ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগপর্যন্ত এটির বিষয়বস্তু রাখা হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান ও ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক পল লুইস ‘নাজা’কে বর্ণনা করেছেন গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোর উন্মোচন ও যাচাইয়ে বছরের পর বছর ধরে করা শ্রমসাধ্য এক কাজের চূড়ান্ত রূপ’ হিসেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি একে ‘রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও সিনেমার দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

শেয়ার করুন