গোয়েন্দা তৎপরতার অভাবে হাতছাড়া পাচার হওয়া ৩০৭ কোটি টাকা

প্রকাশ:

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে যথাযথ আইনি প্রস্তুতির অভাবে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর লন্ডনের ইউবিএস এজি শাখার একটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের সন্ধান পেয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা। এই অর্থ জব্দ করে এনসিএ বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অবহিত করলেও, নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি ও তথ্য পাঠাতে না পারায় অর্থটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৩ জানুয়ারি এনসিএ প্রথম ঢাকার গোয়েন্দাদের বাংলাদেশি এক নাগরিকের লন্ডনে থাকা অর্থের বিষয়টি জানায়। পরবর্তীতে ৯ ফেব্রুয়ারি শওকত আলী চৌধুরীর নাম নিশ্চিত করা হয়। এই অর্থ আটকে রাখার জন্য যুক্তরাজ্যের আইনি ব্যবস্থায় চার সপ্তাহের একটি প্রাথমিক সময়সীমা ছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে বিএফআইইউ কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ বা আদালতের মাধ্যমে অর্থ জব্দের আদেশের কপি জমা দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে এনসিএ সেই অর্থ আর আটকে রাখতে পারেনি এবং তা লন্ডন থেকে কৌশলে দুবাইয়ে সরিয়ে নেয়া হয়।

গত বছরের জুলাই মাস থেকে বিএফআইইউর তত্ত্বাবধানে শওকত আলীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। এর মধ্যে এনসিএ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের কাছে জানতে চেয়েছিল, ওই অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান কোনো অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না এবং দেশে তার কোনো সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে কি না।

১৯ ফেব্রুয়ারি এনসিএ এক বার্তায় স্পষ্ট জানিয়েছিল, যুক্তরাজ্যে অর্থ আটকে রাখার মেয়াদের আগেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো অবস্থান ও আইনি ভিত্তি উপস্থাপন জরুরি। তবে বিএফআইইউর তরফ থেকে যে তথ্য পাঠানো হয়েছিল, তাতে অর্থের সঙ্গে অপরাধের নির্দিষ্ট যোগসূত্র বা আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোকের মতো দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপের উল্লেখ ছিল না। ২২ ফেব্রুয়ারির জবাবে বিএফআইইউ শওকত আলীকে কেবল একজন ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে।

তদন্তাধীন থাকা এসব বিষয় নিয়ে বিএফআইইউর কার্যক্রম ছিল কিছুটা ধীর ও অগোছালো। ২৫ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটি আরও কিছু তথ্য প্রদান করে জানায় যে, শওকত আলী দেশে নেই এবং এনবিআর, সিআইডি ও দুদক নিজ নিজ অবস্থানে তদন্ত করছে। ওই তদন্তে এনবিআরের কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডির পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান যুক্ত ছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে যে নির্দিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ প্রয়োজন, তা তখন পর্যন্ত অনুমোদিত না থাকায় তথ্য আদান-প্রদান আরও জটিল হয়ে পড়েছিল।

২৭ ফেব্রুয়ারি এনসিএর আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত বার্তা আসে যে, তারা আর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ তখনো অভিযোগপত্র দিয়ে মামলা করলে অর্থ আটকাতে আদালতে আবেদনের সুযোগ ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি তৈরি না হওয়ায় সেই পথও বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ মার্চ বিএফআইইউ শওকত আলীর বিনিয়োগ বা অর্থ পাঠানোর অনুমোদনের অভাবের কথা জানালেও, ব্রিটিশ সরকার ১৯৭৯ সালেই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ায় সেই যুক্তির কার্যকারিতা ছিল না।

উল্লেখ্য, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকার বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তা প্রক্রিয়া জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। তবে এই ২৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারের ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্থাটির সঙ্গে এনসিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে সময় তার ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২৩ ফেব্রুয়ারির এক বার্তায় সংস্থাটির কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির জন্য নির্দিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কোন অপরাধের তদন্ত হচ্ছে, তদন্তের অগ্রগতি কতটুকু এবং অর্থের সঙ্গে সেই অপরাধের যোগসূত্র কী— এসব প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ, বাংলাদেশ চাইলে তখনও আইনি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যুক্তরাজ্যের সহায়তা চাইতে পারত।

শেয়ার করুন