রাজধানীর ইসিবি চত্বরে অবস্থিত নিউগিনি প্রপার্টিজে গত শনিবার রাতে এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রায় দুই শতাধিক অস্ত্রধারী ব্যক্তি পুরো আবাসন এলাকায় ঢুকে তাণ্ডব চালায়। এ সময় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউন ফিস’সহ ভবনের বিভিন্ন অফিস ও আবাসিক ইউনিটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিউগিনিতে হামলায় সাবেক সেনা-কর্মকর্তা গ্রেপ্তার। লুট করা হয় ভবনে থাকা বিভিন্ন অফিস ও আবাসনের মালামাল।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অন্যতম হলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। গত বুধবার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের গুলশান বিভাগের সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করেন। ৬৬ বছর বয়সী গোলাম মহিউদ্দিনকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা মামলায় ৪ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম। এছাড়া কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানসহ বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। রোড নম্বর ৯, মিরপুর ডিওএইচএস কালচারাল সেন্টার, মিরপুর।
হামলার পর থেকে নিউগিনি প্রপার্টিজ ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও নিয়ে নতুন সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ৫ হাজার বর্গফুটের যে শেডটিতে স্টুডিও তৈরি করা হয়েছে, সেই ভাড়ার মূল চুক্তিপত্রে সালমান মুক্তাদিরের নাম নেই। চুক্তিটি হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের বন্ধু এসএম রিফাত মেননের নামে। ২০২৫ সালের ১লা নভেম্বর সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তিতে প্রথম পক্ষ হিসেবে নাম রয়েছে জুলাই হত্যা মামলার আসামি মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার। পিতা আবু তাহের ভূঁইয়া, যার ঠিকানা মানিকদি রোড, ক্যান্টনমেন্ট। নথি বলছে, ৫ হাজার বর্গ ফুটের ওই শেডের ভাড়ার চুক্তিপত্রে সালমান মুক্তাদিরের নাম নেই। বাসা ৫১২/১০, মানিকদি রোড, ক্যান্টনমেন্ট থানা। চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়— ‘ঢাকা-১২০৬ এর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মানিকদি রোডের ৫১২/১০ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত রাজউক অনুমোদিত ৬তলাবিশিষ্ট আবাসিক ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ইজারা প্রদানকারীর মালিকানাধীন এবং তিনি এর আইনগত স্বত্ব ও দখলের অধিকারী। সম্পত্তিটির মোট আয়তন ৬ হাজার ৮০০ বর্গফুট। এর মধ্যে ইজারাযোগ্য অংশের (পূর্ব ও উত্তর দিক) আয়তন ৫ হাজার বর্গফুট।
চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী, এসএম রিফাত মেনন চার বছরের জন্য এই জায়গাটি ইজারা নিয়েছেন। ইজারার মেয়াদ ১লা নভেম্বর ২০২৫ থেকে ৩১শে অক্টোবর ২০২৯ পর্যন্ত। চুক্তিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ইজারাগ্রহীতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে এই স্থান ভাড়া বা সাব-লেট দিতে পারবেন না। এছাড়া মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। যদিও বাস্তবে সেখানে সালমান মুক্তাদির তার স্টুডিও গড়ে তোলেন। যদিও ঘটনার দিন সালমান দাবি করেছিলেন যে, হামলাকারীরা এটি তার স্টুডিও বলে জানত না।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই হত্যা মামলার (সিআর মামলা নং ৭০৪/২০২৫) আসামি নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়াকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসএম রিফাত মেনন এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন এবং বিষয়টি সালমান মুক্তাদির আগে থেকেই জানতেন। ঘটনার দিন সালমান নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, প্রপার্টির মালিক আওয়ামী লীগ করেন এবং চাঁদা দাবি করাকে কেন্দ্র করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে ঘটনার পেছনের আর্থিক লেনদেনের তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সালমান মুক্তাদিরের সকল ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, কেওয়াইসি এবং স্টেটমেন্ট তলব করেছে। বুধবার সকালে ব্যাংকগুলোতে পাঠানো ইমেইল বার্তায় দ্রুত এই তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। সালমান মুক্তাদির একে চাঁদাবাজির জেরে হামলা বলে দাবি করলেও, নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার দায়ের করা মামলায় জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা পুরো ঘটনার তদন্ত করছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সূত্র: মানবজমিন








